১ । অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম
দহে
মুলভাব : অন্যায়কারী এবং অন্যায়কে যে প্রশ্রয় দেয় তথা অন্যায় সহ্য করে, উভয়েই সমান অপরাধী।
নিজে অন্যায় না করলেই যে তার কর্তব্য ফুরিয়ে যায় এমনটি নয়। বরং অন্যায়কে প্রতিহত করাই সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। সমাজকে যারা উৎপীড়ন করে, ব্যক্তির অধিকারকে যারা হরণ করে, মানুষের বহু অীভজ্ঞতা এবং প্রযত্নে রচিত আইন ও শৃখলাকে যারা বিঘ্নিত করে তারা নিঃসন্দেহে অন্যায়কারী। অন্যায়ের যেমন বহুক্ষেত্র আছে, অপরাধেরও তেমনি মাত্রার তারতম্য আছে। এই মাত্রা অনুসারেই অন্যায়কারীর অপরাধের পরিমাপ করা হয়। আইনের দৃষ্টিতে অন্যায়কারী বা অপরাধী দণ্ডযোগ্য বলে বিবেচিত। কিন্তু অন্যায়কে যারা দিনের পর দিন নিঃশব্দে সহ্য করে, তারাও কি পরোক্ষভাবে পাপের প্রশ্রয় দিয়ে সমান অপরাধী নয়? অবশ্যই তারাও সমান অপরাধী। সমাজের মধ্যে মুষ্টিমেয় মানুষের মধ্যে যেমন রয়েছে অপরাধের প্রবণতা, তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রয়েছে অন্যায়কে মানিয়ে চলার মানসিকতা। এই মানসিকতায় কতখানি ক্ষমাশীলতা, কতখানি ঔদার্য, কতখানি সহনশক্তি তার পরিমাণ করা দুঃসাধ্য। বস্তুত মানুষ শুধু তিতিক্ষা ও করূণাবশতই অন্যায়কারীকে ক্ষমা করে না; তার এ মনস্তত্বের নেপথ্যে রয়েছে এক আত্ম-পলায়নী মনোভাব। নিজেকে অপরাধীর সংস্রব থেকে দূরে সরিয়ে রাখাকেই সে নিরাপদ বলে মনে করে। অধিকাংশ মানুষেরই এই নির্লিপ্ত নিঃস্পৃহতা অন্যায়কারীকে পরোক্ষভাবে সাহস যুগিয়েছে। স্বার্থভীরু আত্মমগ্ন মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠতে ভয় পায়। এভাবেই সমাজে অপরাধপ্রবণতা কালক্রমে প্রবল হয়ে ওঠে; অত্যাচারীরা নির্ভয়ে মাথা উঁচু করে চলে। মানব সংসারে অন্যায়কারীরা ঘৃণিত হলেও অন্যায় সহ্যকারী কিংবা ক্ষমাকারীরা ঘৃণিত বলে বিবেচিত হয় না। মানুষের ন্যায়-অন্যায়ের এই চেতনাও ভ্রান্ত। অন্যায়কারীর মত সহ্যকারীও সম-অপরাধে অপরাধী। মানুষ্যত্বের বিচারে মানুষের এই বিকৃতিও ক্ষমার অযোগ্য। বিশ্ববিধাতার ঘৃণার রুদ্র রোষানলে অন্যায়কারীর মত অন্যায় সহ্যকারীও বিশুষ্ক তৃণের মত ভস্মীভূত হবে। আসলে বস্তুজগতের স্থুল বিচারে সে নিরাপরাধের ছাড়পত্র পেলেও নিখিল বিশ্বমানবতার দরবারে তার অপরাধের রেহাই নেই। কারও অপরাধ ক্ষমা করা মনুষ্যত্বেরই পরিচয়। তবে উদারতা ও ক্ষমার মাত্রা থাকা চাই। ক্ষমা পেয়ে যে বার বার অন্যায় করতে থাকে সে ক্ষমার যোগ্য নয়। এতে তার অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। এই ধরনের অন্যায়কারীর অন্যায় ক্ষমা করা কোনো মহৎ ব্যক্তির কাজ হতে পারে না। বরং সেও অন্যায়কারীর মতো সমান অপরাধী বলে গন্য হবে।
২ । দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার
মুলভাব ঃ অপরাধীকে মার্জনা না করে যথাযোগ্য দণ্ড যিনি দিতে পারেন তিনিই শ্রেষ্ঠ বিচারক। বিচারকের দায়িত্ব পালন করতে হবে অপরাধীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ।
বিচারকের কাজ অপরাধীর শাস্তি বিধান করা। বিচারের মূল লক্ষ্য হল প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি বিধান করা এবং নিরপরাধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য তখনই সার্থক হবে, যখন বিচারের মধ্যে প্রামাণিক সাক্ষ্য ও মানবিক বিবেচনার সমন্বয় ঘটবে। ন্যায়-অন্যায় নিয়েই আমাদের কর্মজীবন। ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি সর্বত্র সাধুবাদ পেয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, অন্যায়কারী হয় দণ্ডিত। অন্যায় করেছে বলে অন্যায়কারীকে যথোচিত শাস্তি দিতে হয় বটে, তবে সে শাস্তি যান্ত্রিক না হওয়াই কাম্য। কারণ, অন্যায়কারীও মানুষ। অন্যায়কারী হিসেবে তার প্রাপ্য শাস্তি যেমন তাকে দিতে হবে একইসাথে একজন মানুষ হিসেবে তার প্রাপ্য সহানুভূতি, মমত্ববোধ এবং ভালবাসা তাকে দেখাতে হবে। তাই তাকে সংশোধনের পথ দেখাতে হবে। তার নির্মল জীবনযাপনের সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিতে হবে । অপরাধীকে ন্যায়ের পথে আনাই বিচারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে পবিত্র বাইবেলে ঘোষিত হয়েছে, 'পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়।' তাই বিচারকের দায়িত্ব পালন করতে হবে অপরাধীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে । বিচারের মাধ্যমে অপরাধীকে বুঝিয়ে দিতে হবে অপরাধ নিন্দনীয়। অন্যায়কারীর মনে অনুশোচনা জাগাতে একমাত্র সহানুভূতিমিশ্রিত দণ্ডই পারে ; অন্যথায় তার মনে আইনের প্রতি লেশমাত্র শ্রদ্ধাবোধ থাকবে না । সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। তবে এই মমত্বের অর্থ এই নয় যে, বিচারক গুরু পাপে লঘু দণ্ড দেবেন। এরকম হলে বিচারকার্য ব্যাহত হবে। বিচারক অবশ্যই তাঁর দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ আসন থেকে নিরপেক্ষভাবে পবিত্র দায়িত্ব পালন করবেন। এটাই সকলের কাম্য। বিচারকের দায়িত্ব সুকঠিন বলেই তিনি সমাজের শ্রেষ্ঠ মর্যাদার আসনে সমাসীন। দণ্ডিতের প্রতি বিচারকের সমবেদনা থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন তাঁর প্রাপ্য দণ্ডকে লঘু না করে। বিশ্ববিধানের শৃঙ্খলাকে যে ভঙ্গ করেছে, মনুষ্যত্বকে যে আঘাত করেছে দণ্ড তাকে গ্রহণ করতেই হবে। হৃদয়াবেগের বশীভূত হয়ে তার অপরাধকে মার্জনা করার অধিকার কারোর নেই। ভালবাসা সত্ত্বেও যিনি অপরাধীকে মার্জনা না করে যথাযোগ্য দণ্ড দিতে পারেন তিনিই শ্রেষ্ঠ বিচারক। দণ্ডিতের বেদনা তাঁর বুকে বাজবে, কিন্তু দণ্ডদানে তিনি অবিচলিত থাকবেন।
৩। বিশ্রাম কাজের অঙ্গ একসাথে গাঁথা নয়নের অংশ যেন নয়নের পাতা।
মূলভাব: চোখের পাতা এবং চোখ একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তেমনি শ্রম এবং বিশ্রাম একটির সঙ্গে অপরটি সম্পর্কযুক্ত। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে কল্পণা করা যায় না।
সম্প্রসারিত ভাব: মানুষ দুটি সম্পদ জন্মসূত্রে লাভ করেছে। একটি সম্পদ হল কাজ (শ্রম) এবং অপরটি বিশ্রাম। যখন থেকে সে কাজ করার অধিকার পেয়েছে তখন স্বাভাবিকভাবেই বিশ্রাম লাভের সুবিধাও অর্জন করেছে।
শ্রমের প্রয়োজনেই বিশ্রাম গ্রহণের আবশ্যকতা। মানুষের ওপর ন্যস্ত হয়েছে কাজ অর্থাৎ কাজ করার জন্যেই সে নিয়োজিত। আবার কাজের সাথে সাথে তার বিশ্রামের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বিশ্রাম কাজ করার জন্য প্রেরনা যোগায়, উৎসাহ সৃষ্টি করে। যেখানে শ্রম নেই, সেখানে বিশ্রামের প্রয়োজন নেই। যারা শ্রমজীবী নয় তাদের কাছে বিশ্রামের কোন মূল্য নেই, যেখানে বিশ্রামের প্রয়োজিত কেবল তারাই বিশ্রামের মাধুর্য উপলব্ধি করতে পারে।
চোখের পাতার অপরিহার্যতা চোখের জন্যে; নচেৎ চোখের পাতাহীন চোখের কথা কেউ কি কখনও ভাবতে পারে ? চোখের স্বাভাবিকতার জন্যেই চোখের পাতার প্রয়োজন। শ্রমের ক্লান্তি দুর করার জন্য তেমনি বিশ্রাম প্রয়োজন ।
চোখ এবং চোখের পাতা-এ দুই প্রত্যঙ্গ যেমন অপরিহার্য- তেমনি শ্রম এবং বিশ্রাম-এ দুটিও অপরিহার্য। মানুষ একটানা কাজ করতে পারেনা। যদি কেউ করে তা'হলে তার স্নায়ুগুলো অবসন্ন হয়ে পড়বে। এ অবসাদ দূর করার জন্যেই বিশ্রামের প্রয়োজন। বিশ্রাম মানব দেহের অবসাদ দূর করে, তার কর্মশক্তি ফিরিয়ে আনে।
শ্রম ও বিশ্রাম একে অপরের যেমন পরিপূরক। তেমনি চোখ ও চোখের পাতা একে অন্যের পরিপূরক। এর একটি অপরটি ছাড়া কল্পনাও করা যায় না।
৪। পরের অনিষ্ট চিন্তা করে যে জন নিজের অনিষ্ট বীজ করে সে বপন
মূলভাব: যে ব্যক্তি অপরের অনিষ্ট চিন্তা করে সে দু'দিন আগে হোক আর পরে হোক নিজের অনিষ্টও ভোগ করে, সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
সম্প্রসারিত ভাব: বিশ্বের সমস্ত ধর্মশাস্ত্রে অপরের মঙ্গল কামনাকারীর প্রশস্তি কীর্তন করা হয়েছে। যারা
পরের অনিষ্ট করে তারা দুষ্কৃতিকারী। নিজের অপকর্মের ফল তাদেরকে ভোগ করতেই হবে। যে অন্যায় করে সে নিজের বিবেকের কাছে অপরাধী। অতএব তার অন্তরে আত্মগ্লানিরূপ নরকানল সব সময় প্রজ্জ্বলি থাকে। মুহূর্তের জন্যেও তার জীবনে স্বস্তি নেই। বাস্তবেও আমরা এর প্রতিফল দেখতে পাই। অনিষ্টকারীকেই পর্যাপ্ত শাস্তি ভোগ করতে হয়। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। অতএব পরের অনিষ্ট সাধনের মত কোন গর্হিত কাজ করার চিন্তা থেকে আমাদের সকলেরই প্রত্যেককে রক্ষা করা উচিত। অপরের অনিষ্ট চিন্তা করা মহাপাপ একথা আমাদের প্রতি মুহূর্তে স্মরণ রাখতে হবে । যে কাজে অন্যের অনিষ্ট ঘটবে সে কাজ করা কোন সুবিবেচক লোকের উচিত নয়। সুতরাং লোকহিতকর কর্ম সম্পাদনে আমরা আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করবো। এ মর্মে উল্লেখ্য যে, দেখ ভাই চরাচরে, যে যেমন কর্ম করে তেমনি ফল সে তার পায়। মানব জীবনের মহৎ গুণাবলীর মধ্যে পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরোপকারের মত মহৎ গুণের তুলনা নেই। অধিকাংশ মানুষের জীবন দুঃখ-দারিদ্র্যে পরিপূর্ণ। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা সবার থাকা উচিত। মানুষের জীবন থেকে অভাব-অনটন, দুঃখ-দুর্দশা দূর করতে হবে। তবেই এই পৃথিবীর মানব জীবন সুখকর হবে ।
তাই আমাদের সমাজে এক শ্রেণীর লোক আছে যারা অপরের কল্যাণ তো করেই না, বরং অপরের ক্ষতিসাধনে নিয়োজিত থাকে। কিন্তু তাদের বিপদ যে তারা নিজেরাই ডেকে আনছে তা তারা জানে না। ফলে তারা অজ্ঞাতসারে নিজেদেরই অনিষ্ট ডেকে আনে।