নিঃসন্তান সৌদামিনী মালো দুর্ভিক্ষে মৃত এক মুসলমান কৃষক পরিবারের অসহায় শিশুপুত্রকে মাতৃস্নেহে বুকে তুলে নেয়। শিশুর নাম দেয় হরিদাস। বড় হয়ে হরিদাস যখন জানতে পারে সে মুসলমানের ছেলে তখন সে সৌদামিনীকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। হরিদাসকে হারিয়ে সৌদামিনীর মাতৃহৃদয় হাহাকার করে উঠে। ধর্ম, বর্ণ, অর্থ এসবকিছুর ঊর্ধ্বে মাতৃত্ব। শওকত ওসমানের 'সৌদামিনী মালো' ছোটগল্পটিতে এভাবে মানবতার জয়গান ধ্বনিত হয়েছে।
ক. 'আহ্বান' গল্পের বুড়িকে কে মা বলে ডাকে?
খ. 'আমার মন হয়তো ওর ডাক এবার আর তাচ্ছিল্য করতে পারেনি'- ব্যাখ্যা করো।
গ. 'সৌদামিনী মালো' গল্পটির সাথে 'আহ্বান' গল্পের সাদৃশ্য- বৈসাদৃশ্য আলোচনা করো।
ঘ. উদ্দীপকের মূল বক্তব্য 'আহ্বান' গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর
(ক) 'আহ্বান' গল্পের বুড়িকে হাজরা ব্যাটার বউ মা বলে ডাকে।
(খ) 'আহ্বান' গল্পে কথিত বুড়ির সাথে গল্পকথকের আত্মিক সম্পর্কের দিকটি উন্মোচিত হয়েছে।
গল্পকথককে বড় বেশি স্নেহ করতেন বুড়ি। তার স্নেহের আবেদনকে উপেক্ষা করতে পারেননি কথকও। তাই অনেকদিন পর গ্রামে এসে বুড়ির মৃত্যুর কথা শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন লেখক। বুড়ির স্নেহের টানে গ্রামে এসেছেন- কথকের এ উপলব্ধির দিকটিই প্রশ্নোক্ত উত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে।
(গ) বিষয়বস্তুগত দিক থেকে সাদৃশ্য থাকলেও সমাজ ব্যবস্থার নিরীখে 'আহ্বান' গল্পের সঙ্গে 'সৌদামিনী মালো' গল্পের প্রভেদ বিদ্যমান।
'আহ্বান' গল্পের বুড়ির মাঝে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নিরপেক্ষ চিরন্তন মাতৃরূপ প্রকাশ পেয়েছে। একারণেই মুসলিম হয়েও হিন্দু গোপালকে আপন পুত্রের মতো স্নেহ করেছে সে। তার খাওয়ার জন্য ফল এনে দিয়েছে, বসার জন্য বুনেছে খেজুর পাতার চাটাই। উদ্দীপকের সৌদামিনী মালোর মাঝেও এমন সর্বজনীন মাতৃত্বের পরিচয় বিধৃত হয়েছে।
উদ্দীপকের সৌদামিনী মালোর সন্তান-বাৎসল্যের কাছে পালিত পুত্র হরিদাসের ধর্ম-পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠেনি। এজন্য নিজে হিন্দু ধর্মের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানের পুত্রকে আপন করে নিয়েছে সে। পরবর্তীতে হরিদাস তার প্রকৃত পরিচয় জানতে পেরে নিরুদ্দিষ্ট হয়ে গেলে হাহাকার করে উঠেছে সৌদামিনীর হৃদয়। মাতৃহৃদয়ের অনুভূতি প্রকাশে 'আহ্বান' গল্পের বুড়িও সৌদামিনীর মতোই অনন্য। তাইতো নিঃসংকোচে গোপালের কাছে নিজের কাফনের কাপড় দাবি করেছে সে। বুড়ির আন্তরিক আহ্বানেই যেন গোপাল মৃত্যুর পরদিন গ্রামে এসে হাজির হয়েছে। এদিক থেকে গল্প দুটির মধ্যে মিল পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু 'আহ্বান' গল্পের সমাজ উদারতার পরিচয় দিয়ে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কথক ও বুড়ির সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিলেও উদ্দীপকে সামাজিক সংকীর্ণতার কারণে সৌদামিনীর সন্তানকে হারাতে হয় যা 'আহ্বান' গল্পের সঙ্গে 'সৌদামিনী মালো' গল্পের বৈসাদৃশ্য নির্দেশ করে।
(ঘ) শাশ্বত মাতৃত্ব ও মানবিকবোধই 'আহ্বান' গল্পের মূলসুর, যা উদ্দীপকেও প্রাধান্য পেয়েছে। গল্পের মূলসুর, যা উদ্দীপকেও প্রধ্যান্য পেয়েছে।
'আহ্বান' একটি উদার মানবিক সম্পর্কের গল্প। এখানে বুড়ির হৃদয়ে গোপালের প্রতি যে অপত্যস্নেহের প্রকাশ ঘটেছে তার কাছে জাতি-ধর্ম- বর্ণ পরিচয় নিমেষেই তুচ্ছ হয়ে গেছে। উদ্দীপকে এমন মাতৃহৃদয়ের পরিচয় পাওয়া গেলেও সেখানকার সমাজ ব্যবস্থা 'আহ্বান' গল্পের সমাজ ব্যবস্থা থেকে অনেকটাই ভিন্ন।
উদ্দীপকে উল্লিখিত গল্পের সৌদামিনী মালো অসামান্য স্নেহবৎসল এক নারী। তাইতো মুসলমানের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে পালন করতে কোনো দ্বিধা হয়নি তার। তবুও হরিদাসকে নিজের কাছে আগলে রাখতে চেয়ে সমাজের চাপে ব্যর্থ হয়েছে সে। তবে হরিদাসকে হারিয়ে সৌদামিনীর হৃদয়ে যে হাহাকার ধ্বনিত হয়েছে তা জাতি-ধর্ম-বর্ণের ব্যবধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বস্তুত এ গল্পে সৌদামিনীর মাতৃহৃদয়ের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক চেতনা। এমনি মাতৃহৃদয়ের পরিচয় 'আহ্বান' গল্পে পাওয়া যায় বুড়ি চরিত্রের মাঝে।
উদ্দীপক ও 'আহ্বান' গল্প উভয়ক্ষেত্রে সামাজিক সব প্রতিবন্ধকতা পরাজিত হয়েছে সৌদামিনী মালো ও বুড়ির অপত্যস্নেহের কাছে। একারণে হতদরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও বুড়ি যেমন গোপালের জন্য ফল নিয়ে এসেছে তেমনি গোপালও তার মাতৃহৃদয়ের আবেদনকে উপেক্ষা করতে পারেনি। আর তাই স্নেহের প্রতিদানে কথক বুড়িকে টাকা দিলে কষ্ট পেয়েও বুড়ি দমে যায়নি বরং নতুন উদ্যমে পরের দিন আবারও গোপালের জন্য কিছু একটা নিয়ে এসেছে। আর সবশেষে সে যে গোপালের কাছে কাফনের কাপড় ছেয়েছে, তাতে নিঃসন্দেহে গোপালের প্রতি তার গভীর ভাবাবেগের দিকটিই প্রকাশিত হয়েছে। উদ্দীপকের সৌদামিনীও তেমনি এক স্নেহময়ী মা। সে বিবেচনায় উদ্দীপক ও 'আহ্বান' গল্পে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মাতৃস্নেহের আবেদনই বড় হয়ে উঠেছে।
