লালসালু : সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর
১ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
ক. মহব্বত নগর গামে মজিদকে সবার আগে দেখেছিল তাহের।
খ. আমেনা বিবি
যখন মাজার পাক দেওয়ার জন্যে পালকি থেকে নামে, তখন
অসতর্কতাবশত তার পায়ের কিছুটা অংশ উন্মেচিত হয়ে যায়, যা মজিদ দেখে ফেলে।
পায়ের বর্ণনা
দিতে গিয়ে লেখক বলেছেন: "সাদা মসৃণ পা, রোদ-পানি বা
পথের কাদামাটি যেন কখনো স্পর্শ করেনি।" স্পষ্টতই আমেনা বিবির ফর্সা পা তাকে
উত্তেজিত করে তোলে, তার ভেতর নিষিদ্ধ ভাব জাগিয়ে দেয়।
এই ভাব অবদমন করার জন্যেই হোক আর খালেক ব্যাপারীর কাছে লুকানোর জন্যেই হোক অথবা
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কাটোনোর জন্যে হোক, সে মিহি সুরে
দোয়া-দুরুদ পড়তে শুরু করে, গলার কারুকাজ আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে
এই আবেগের উৎস যে লিবিডো, এতে কোনো সন্দেহ নেই; কেননা লেখক স্পষ্ট করেই বলেছেন, "সুন্দর
পা দেখে
স্নেহ-মমতা ওঠে না এসে, আসে বিষ।"
গ. সৈয়দ
ওয়ালীউল্লাহ্ 'লালসালু' উপন্যাসের মজিদের প্রথম স্ত্রী রহিমা এবং উদ্দীপকের ফজিলাতুন নেসা চরিত্রটির
ভেতর মিল এবং অমিল দুটিই রয়েছে।
প্রথমে আমরা
মিলের দিকগুলো আলোচনা করতে চাই, পরে আলোকপাত করা হবে
অমিলের ক্ষেত্রগুলোয়। মিল এই যে, রহিমা এবং ফজিলাতুন
নেসা দুজনই স্বামীর একান্ত অনুগত, নিতান্ত বাধ্যগত।
লম্বা চওড়া শরীরের রহিমা তার শক্ত সমর্থ দেহ নিয়েও যেমন পদে পদে বেঁটে, দুর্বল, ক্ষীণস্বাস্থ্য মজিদের আজ্ঞাবহ দাসী; আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ফজিলাতুন নেসা নিজে চাকরি করে স্বামী সংসারের যাবতীয়
ব্যয় নির্বাহ করার পরেও তেমনই স্বামীর প্রতি বাড়াবাড়ি রকম অনুগত। এটাই তাদের মিল।
দুজনের স্বামী অযোগ্য, তবু তারা দুজনই সমর্পিতা।
অমিল হলো, রহিমা অশিক্ষিতা, গ্রামীণ সমাজে বেড়ে উঠা নারী যে
কিনা
বিনা যুক্তিতেই
স্বামীর যে কোনো কথাকে নির্বিচারে মেনে নেয় কিন্তু ফজিলাতুন নেসার ক্ষেত্রে এ কথা
খাটে না। সে একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা। তার স্বামী এম.এসসি ডিগ্রিধারী
হয়েও ঘরে বসে সারাক্ষণ টিভি দেখেন-তাও আবার হিন্দি নাচ-গান। উদ্দীপকে বলা হয়েছে; গতকাল এশার নামাজ না পড়েই ফজিলাতুন নেসা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন........."
অর্থাৎ ফজিলাতুন নেসা নিয়মিতই পড়েন, কেবল ওই দিন
ক্লান্তিবশত পড়তে পারেন নি- উদ্দীপকের প্রথম বাক্যেই তাকে 'ঘুমকাতুরে' বিশেষণ দেওয়া হয়েছে। অথচ এই জন্যে তার
হিন্দি নাচ- গান দেখা স্বামী তাকে অনেক গালমন্দ করেন এবং ভদ্রমহিলা তার কোনো
প্রতিবাদ না করে সারারাত নফল নামাজ পড়ে পরের দিন অফিসে যান। এটি কী ধরনের
পতিভক্তির নমুনা? রহিমা পতিভক্ত কিন্তু এতটা নয়।
জমিলাকে মাজারে বেঁধে রেখে আসার ব্যাপারটি সে পছন্দ
করেনি। তখন থেকেই তার আনুগত্যে চিড় ধরেছে। মজিদকে সে স্পষ্ট কণ্ঠে যখন বলে, "ধান দিয়া কি হইবো, মানুষের জান যদি না থাকে? আপনে ওরে নিয়া আসেন ভিতরে।" তখন আমরা বুঝি এই রহিমা আর আগের রহিমা নেই; এ নতুন রহিমা। 'লালসালু'র রহিমার প্রতি পাঠকের সহানুভূতি জাগে, আর উদ্দীপকের ফজিলাতুন নেসার প্রতি জাগে বিদ্রুপ।
ঘ. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর 'লালসালু' উপন্যাসের চরিত্রগুলো স্কেচের মতো করে আঁকা হয়েছে। প্রায় সব চরিত্রই দেশ-কাল-পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাপিত এবং তুলনারহিত সৃষ্টি।
রহিমা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর নির্মিত সকল চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। আর্য সমাজে এমন একটি কথা প্রচলিত ছিল যে পাক করলেই কেবল নারী হয়ে জন্ম নিতে হয়। সগদ্বিখ্যাত অনেক নারী ক্ষোভ ও দুঃখের সাথে নারী হওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন শিল্পের নানা মাধ্যমে। সেগুলো যে খুব একটা বাড়িয়ে বলা নয়, তার প্রমাণ রহিমা চরিত্রটি। কৃষকায়, রোগা, বয়স্ক, খাটো, ভগ্নস্বাস্থ্য এই লোকটির কাছে রহিমার বাবা-মা নির্দ্বিধায় তাদের মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিল। অথচ তারা জানেই না কে এই মজিদ, কী তার পরিচয়? কোনো ভাবে মেয়েকে বিদায় করা গেছে স্বামী যেমনই হোক, পাত্রস্থ করা গেছে এই হলো বাবা মায়ের চিন্তা। যেমন বাবা-মা, তেমন তাদের সন্তান। রহিমাও তেমনই সমর্পিতা নারী। মজিদ যা বলে, তাই সই। সাত চড়ে তার রা নেই। সুতরাং বলা যায়, রহিমা একজন সনাতন গ্রামীণ বাঙালি নারী। রহিমার মধ্যে গৃহস্থভাব প্রবল। ঘরের সব কাজকর্ম নিপুণ হাতে সে সামাল দেয়। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সে। রাতের বেলা সে মজিদের শুকনো পা-ও টিপে দেয়। বলা যায়, মজিদকে সুখে-শান্তিতে রাখার জন্যে সম্ভব সবকিছুই সে করেছিল। তার ভেতর সন্তানের জন্য একটা হাহাকার ছিল যেটা সে পূরণ করে নিয়েছিল জমিলাকে দিয়ে। জমিলাকে সে কখনও সতীন হিসেবে দেখেনি, দেখেছে কন্যা হিসেবে। উপন্যাসের শেষে জমিলার বিদ্রোহী রূপ পাঠককে চমকিত, বিস্মিত, অভিভূত ও মুগ্ধ করে। সব কিছুরই একটা সীমা আছে যা পেরিয়ে গেলে বাঁধ ভেঙে যায়। মজিদ যখন জমিলার ওপর সীমাহীন নির্যাতন শুরু করে, তখন রহিমার এই বিদ্রোহী রূপ আমরা দেখি।
২ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
ক মতলুব খাঁ
হচ্ছে ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট।
খ. 'মজিদ ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। যোগসূত্র হচ্ছে রহিমা।' কথাটি দিয়ে মহব্বতনগর গ্রামের নারীসমাজে রহিমার গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে।
মজিদ পুরুষ। ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে পর্দাপ্রথা শরিয়তসম্মত। মজিদ এটি মেনে চলে। মহব্বতনগর গ্রামের এবং আশপাশের গ্রামের মানুষ তার কাছে যখন তখন ছুটে আসতে পারে, জানতে পারে কিন্তু নারীসমাজ মজিদের সামনে চাইলেই ছুটে আসতে পারে না। প্রকৃতিগত কারণেই নারীর আবেগ বেশি এবং তা প্রকাশ করার তাড়নাও প্রবল কিন্তু R মহব্বতনগর গ্রামে নারীর আবেগ পরিস্ফুটনের কোনো সরাসরি। পথ নেই, মজিদের কাছে পৌঁছাবার সরাসরি পথ নেই, যোগসূত্র হচ্ছে রহিমা। মহব্বতনগর গ্রামে রহিমার কদরও কম নয়। মজিদের স্ত্রী হিসেবে তার গুরুত্ব ও সম্মান সমাজে স্বীকৃত। মজিদ যদি মোদাচ্ছের পীরের মাজারের খাদেম হয়ে থাকে তাহলে রহিমা হচ্ছে তার আদর্শ সেবিকা।
গ. উদ্দীপকের কাশেম মুন্সি চরিত্রটির সাথে 'লালসালু' উপন্যাসের মজিদ চরিত্রটির মিল এবং অমিল দুটি দিকই লক্ষ করা যাবে।
প্রথমে মিলের
দিক আলোচনা করা হবে পরে দৃষ্টিপাত করা হবে অমিলের জায়গায়। মিল এই যে, দুজনই ধর্মকে পুঁজি করে জীবন নির্বাহ করার পথ বেছে নিয়েছে। মজিদ মহব্বতনগর
গ্রামের মানুষকে হাতের মুঠোয় বন্দী করেছে ধর্মের দোহাই দিয়ে, তথাকথিত মোদাচ্ছের পীরের মাজার লালসালু-কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছে সমাজের
চোখ-কান-মুখ। কাশেম মুন্সিও পানিপড়া দিয়ে তার সাংসারিক ব্যয় নির্বাহ করে। দুজনই
ধর্ম ব্যবসায়ী; গ্রামের সহজ সরল মানুষের সরলতার সুযোগ
নিয়ে তারা প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছে।
এবার দৃষ্টিপাত
করা যাক অমিলের ক্ষেত্রগুলোয়। মজিদ একটা পর্যায় পর্যন্ত কাশেম মুন্সির মতোই গণ্য, যখন সে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে গারো পাহাড় থেকে মহব্বতনগর গ্রামে চলে আসে।
কিন্তু গ্রামে সে যখন বাড়াবাড়ি শুরু করে দেয়, তখন সে আর
উদ্দীপকের কাশেম মুন্সি এক রকম ধর্ম ব্যবসায়ী থাকে না। কাশেম মুন্সিকে পাঠক মমতা, করুণার চোখে দেখতে পারে আবার নাও দেখতে পারে কিন্তু মজিদকে দেখে
ঘ. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ একজন অস্তিত্ববাদী কথাশিল্পী। মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কট এবং তা উত্তীর্ণ হয়ে অন্যকে সঙ্কটে ফেলার যে ধারাবাহিক জৈব প্রবৃত্তি মানুষের মধ্যে প্রবহমান, মজিদ চরিত্রটির মধ্য দিয়ে তিনি তা চমৎকারভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তাই 'লালসালু' উপন্যাসটি পাঠ করার সময় মজিদ চরিত্রটি সম্পর্কে আমার ধারণা এক জায়গায় স্থির থাকে নি বরং তা বারবার বদল হয়েছে।
মজিদ সম্পর্কে
আমার চারটি প্রতিক্রিয়া হয়েছে। প্রথম প্রতিক্রিয়াটি হচ্ছে: করুণা। মজিদ যখন গারো
পাহাড়ে মানবেতর জীবনযাপন করতো, জীবনের সঙ্গে লড়াই
করতে করতে সে যখন পর্যুদস্ত, ক্লান্ত, পরাজিত সৈনিক-তখন তার জন্যে আমার রীতিমতো করুণা হলো। এটি উপন্যাসের একদম প্রথম
পর্যায়।
উপন্যাসের
মাঝামাঝি পর্যায়ে তার প্রতি প্রবল ঘৃণা জাগে যখন সে তার ভণ্ডামি দিয়ে গোটা এলাকা
করায়ত্ত করে ফেলে, জমিলার মতো একটি কিশোরী মেয়েকে
বিয়ে করে তার ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে। বাঁধভাঙ্গা ঘৃণায়
আমি উদ্বেল হই মজিদ নামক এই ধর্ম ব্যবসায়ীর ওপর।
উপন্যাসের শেষে
মজিদের প্রতি আমার প্রবল বিতৃষ্ণা জাগে, তার অসহায়তা
আমি উপভোগ করি। কিশোরী বধূ জমিলাকে কোনো ভাবেই বাগে আনতে না পেরে রণক্লান্ত, পরাজিত, বিধ্বস্ত মজিদ তার প্রথমা স্ত্রী
রহিমাকে যখন বলে, "বিবি কারে বিয়া করলাম? তুমি কী বদদোয়া দিছিলা নি?" তখন আমি রীতিমতো উপভোগ
করি এবং আমার আত্মতৃপ্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে ওঠে যখন তার অনুগত প্রথম স্ত্রী রহিমাও
তার অবাধ্য হয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে, "ধান দিয়ে কী হইব, মানুষের জান যদি না থাকে? আপনে ওরে নিয়া আসেন ভিতরে।"
৩ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
ক. 'সালু'
শব্দের অর্থ লাল রঙের কাপড়।
খ. হাসুনির মার
দ্বিতীয় বিয়েতে অনাগ্রহী থাকার কারণ বিচিত্র। তার দাম্পত্য জীবনের ব্যক্তিগত
অভিজ্ঞতাটি নিশ্চয়ই খুবই তিক্ত ছিল- দারিদ্র্যলাঞ্ছিত, সুবিধাবঞ্চিত, অশিক্ষিত সমাজে যেমনটি হয়ে থাকে। স্বামীর
স্ত্রীটিকে একটি প্রয়োজনীয় প্রাণী হিসেবেই ঘরে আসে এবং তাকে দিয়ে ষোল আনা খাটিয়ে
নেয়। কাজে কর্মে একটু এদিক সেদিক ঘটলেই অমানুষিক নির্যাতন-মানসিক তো বটেই, অনেক সময় শারীরিকভাবেও। শ্বশুরবাড়ির মানুষদের সম্পর্কে হাসুনির মায়ের বক্তব্য:
"অরা মুনিষ্যি না।" রহিমা যখন তাকে জিজ্ঞাসা করে, সে আবার বিয়ে করবে কিনা, সে তখন বলে, "দিলে চায় না বুবু।" তার বৃদ্ধ বাবা-মা সারাদিন যেভাবে অকথ্য ভাষায়
ঝগড়াঝাটি করে, তা-ও হাসুনির মার মনে বিয়ে সম্পর্কে
নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করেছে।
গ. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর 'লালসালু' উপন্যাসের মজিদ এবং উদ্দীপকের জয়তুন বেগম চরিত্র দুটির মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করলে আমরা মিল এবং অমিল দুটি দিকই দেখবো। প্রথমে আমরা মিলের দিকে দৃষ্টিপাত করতে চাই, পরে অমিল অংশ আলোকপাত করবো। মিলের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে বলতে হবে, দুজনই ধর্ম ব্যবসায়ী। মজিদ এবং জয়তুন বেগম- দুজনই অশিক্ষিত মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছে। মজিদ আয়ত্তে এনেছে মহব্বতনগর গ্রামের মানুষদের। এই কাজটা সে করেছে সুকৌশলে, ধীরে ধীরে। অপরদিকে জয়তুন বেগম নিয়ন্ত্রণে এনেছে দয়ারামপুর গ্রামের ধর্মপ্রাণ মানুষদের। মিলের মধ্যে দুজনই ধর্মজীবী এবং তাদের উত্থান হয়েছে নাটকীয়ভাবে।
অমিলের কথা
আসলে প্রথমেই যে দিকটি স্পষ্ট হয়ে উঠে, সেটা হলো
মজিদের ক্রমবর্ধমান লোলুপতার পাশে জয়তুন বেগমের অসহায় রূপটি। মজিদ স্পষ্টতই নিপীড়ক, শঠ,
প্রবঞ্চক, প্রতারক, জোচ্চর, বাটপার, লম্পট, উদ্দেশ্যবাজ, ক্রুর, কুটিল, হিংস্র এবং সেই সঙ্গে ধর্ম ব্যবসায়ী। কিন্তু জয়তুন কেবলই ধর্ম ব্যবসায়ী- আর
কিছু নয়। মহব্বতনগর গ্রামে থাকা খাওয়ার পাকা বন্দোবস্ত হয়ে যাওয়ার পরেও মজিদ
ক্ষান্ত হয়নি বরং তার ব্যবসায় আরও বৃদ্ধি কীভাবে করা যায়, সেটা নিয়ে প্রতিনিয়ত চিন্তাভাবনা করেছে, প্রতিদ্বন্দ্বিদের
দমন করেছে। আওয়ালপুরের পীর, আক্কাস তার মিত্রপক্ষ ছিল না সে
লড়াই করেছে দুর্দান্তভাবে যদিও শেষে জমিলা ও রহিমার কাছেই তার শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে।
উদ্দীপকের জয়তুন বেগমের কোনো প্রতিপক্ষ দেখানো হয়নি এবং কাজটি নিতান্ত জীবন
বাঁচানোর জন্যে করেছিলেন বলে তিনি পাঠকের সহানুভূতি পান- মজিদ তা থেকে বঞ্চিত।
ঘ. মানুষ
সমাজের সৃষ্টি। আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিঘাতে এক একজন মানুষ গড়ে ওঠে এক ভাবে।
উদ্দীপকের জয়তুন বেগমও আর্থ- সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিঘাতে গড়ে ওঠে একটি জীবন্ত
চরিত্র। ব্যাপারটি কিভাবে ঘটে, সেটি একটু বিশ্লেষণ
করা যাক।
প্রথমত, জয়তুন বেগম যে এমন হলেন, তার জন্যে দায়ী তার
অর্থব্যবস্থা। লক্ষণীয়, উদ্দীপকে বলা হয়েছে, তিনি বিধবা ও নিঃসন্তান। যদি তার স্বামী কিংবা সন্তান থাকতো, তাহলে বৃদ্ধকালে তাকে এই পানিপড়া ব্যবসায় নিশ্চয় নামতে হতো না। তিনি আর্থিক
দিক থেকে অসহায়। তার আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি যদি ভন্ড হতেন, তাহলে শুরু থেকেই পানিপড়া দিতেন, তা কিন্তু তিনি
দেননি। তখনই দিয়েছেন, যখন দেয়ালে তার পিঠ ঠেকে গেছে।
সুতরাং,
অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত না থাকলে জয়তুন বেগম পানিপড়া দিতেন
না।
দ্বিতীয়ত, জয়তুন বেগম যে এমন হলেন, তার জন্যে দায়ী আমাদের
সমাজব্যবস্থা। আমাদের বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অনাথ বৃদ্ধা নারীর একা বেঁচে থাকা
খুব কষ্ট যদি তার না থাকে স্বামী, না থাকে সন্তান, না থাকে
৪ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
ক. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে জন্মগ্রহণ করেন।
খ. অভাবের তাড়না থেকে মানুষ ছোটে। শস্যহীন জনবহুল এলাকা। ঘরে খাবার নেই। ভাগাভাগি, লুটতরাজ আর স্থান বিশেষে খুনখারাবিও চলে। কিন্তু তাতেও কুলায় না। অভাব যেন তাদেরকে ছায়ার মতো সব সময় ঘিরে থাকে, রাহুর মতো তাদেরকে গ্রাস করতে চায়। কিন্তু মানুষ যে 'অমৃতস্য পুত্রাঃ' অমৃতের সন্তান, সে যে কোনো কিছুর কাছেই হার মানতে নারাজ। যখন কোনো আশাই অবশিষ্ট নেই তখনও সে আশা করে। সেই আশায় ভর করে শস্যহীন জনপদের মানুষ ছোটে, নিরন্তর ছুটে চলে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র 'লালসালু' উপন্যাসে মজিদ এমনই এক ভাগ্যান্বেষণী আশাবাদী মানুষ।
গ.
উদ্দীপকের মফিজ
আপাদমস্তক ভণ্ড, ইতর, শঠ, প্রবঞ্চক। ঢাকায় গিয়ে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে আঁতেল বনে যাওয়া কৃষকপুত্র
মফিজ একদা আল্লাহ খোদার অস্তিতেই বিশ্বাস করতো না, সেই মফিজই চাকরির বয়স ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে আর কোনো উপায় না দেখে গ্রামে চলে
আসে এবং পীর সেজে বসে। নাম বদলে রাখে হযরত শাহ সুফী মফীজ আলী ফরিদপুরী (রঃ)।
ভণ্ডামি আর কাকে বলে! 'লালসালু'র মজিদের প্রতি পাঠকের করুণা জাগলেও জাগতে পারে, কিন্তু উদ্দীপকের মফিজ আলীর প্রতি যে ঘৃণ্য জাগে- এতে কোনো সন্দেহ নেই।
ঘ. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ 'লালসালু' উপন্যাসে মজিদ চরিত্রের মধ্য দিয়ে মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কটকে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। অস্তিত্ববাদী কথাশিল্পী হিসেবে বাংলা সাহিত্যে তাঁর আসন অনেক ওপরে। তিনি লক্ষ করেছিলেন, মানুষ অর্থশাসিত সমাজের সৃষ্টি হলেও সে মূলত আবদ্ধ থাকে তার নিজেরই দেয়ালে। অস্তিত্বের জন্যে মানুষ কখনও দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে পড়ে আবার নিজেই জড়িয়ে পড়ে স্বয়ংসৃষ্ট নতুন কোনো দেয়ালে। অস্তিত্ববাদী কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ মজিদ চরিত্রটির ভেতর দিয়ে মানবচরিত্রের চিরন্তন এই বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
মজিদ
অভাবগ্রস্ত জনপদের বাসিন্দা। জীবন-জীবিকার তাগিদেই সে একদা ছুটে বের হয়েছিল গারো
পাহাড়ের কোনো অঞ্চলে। জীবন সেখানে কঠিন থাকার কারণে সে নাটকীয়ভাবে মহব্বতনগর
গ্রামে প্রবেশ করে- বলা যায় পালিয়ে চলে আসে। মহব্বতনগরের ধর্মভীরু মানুষদের বশীভূত
করে, মোদাচ্ছের পীরের মাজারের আড়ালে সেই বনে যায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী; এমনকি গ্রামের মোড়ল খালেক ব্যাপারীও তার করায়ত্ত। মজিদের ঘর-বাড়ি হলো, জমি-জমা হলো, পছন্দমতো বিয়েও করে সে।
পার্শ্ববর্তী গ্রাম আওয়ালপুরে আরেক পীর সাহেবের আমদানি ঘটলে সে হটিয়ে দেয়; আধুনিক যুবক আক্কাসের স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও সে পণ্ড করে দেয় সুকৌশলে।
বলাবাহুল্য, নিজের অস্তিত্বের সঙ্কটকে অনেক আগেই কাটিয়ে উঠেছিল মজিদ, ভেঙেছিল নিজের দেয়াল কিন্তু সে এবার অন্যের অস্তিত্বের জন্যে হুমকি হয়ে উঠে
জমিলাকে বিয়ে করে। এটি মজিদের দ্বিতীয় পর্ব, বলা যায়, নিজেই জড়িয়ে পড়ে স্বয়ংসৃষ্ট দেয়ালে। প্রথম পর্বে যে মজিদ কুশলী সেনাপতি, দ্বিতীয় পর্বে সে মজিদকেই পাওয়া যায় পরাজিত সৈনিকের
৫ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
ক. ধলা মিয়া
নির্বোধ এবং অলস প্রকৃতির মানুষ ছিল।
খ. প্রশ্নোক্ত
বাক্যটি দ্বারা অপমানিত, ঈর্ষাকাতর মজিদের নির্লিপ্ত ভাবের
কথা বোঝানো
হয়েছে। আওয়ালপুর গ্রামে নতুন এক পীরের আবির্ভাব ঘটে। সে গ্রাম তখন লোকে লোকারণ্য।
পীরের কীর্তিকলাপ দেখতে মজিদও সেখানে যায় কিন্তু বেঁটে হওয়ার কারণে সে পীরের মুখ
দেখতে পায় না, শুধু পাখা নাড়ানো দেখে। সবাই পীরকে নিয়ে
ব্যস্ত,
মজিদকে কেউ সমীহ করে না; এমনকি তাকে
যারা চেনে তারাও না। এতে মজিদ অপমান বোধ করে। ওপরন্তু যখন মতলুব মিয়া পীরের
গুণাগুণ ব্যাখ্যা করে এবং তা শুনে লোকজন ডুকরে কেঁদে ওঠে তখন মজিদ সজোরে নড়তে থাকা
পাখাটার পানে তাকিয়ে মুর্তিবৎ হয়ে বসে থাকে।
গ. ওয়াসিকা
লালসালু উপন্যাসের জমিলার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
আমাদের সমাজ
নানারকম কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাসের নাগপাশে আবদ্ধ হয়ে অন্ধকারে তলিয়ে যেতে
বসেছে। মানুষকে অবমূল্যায়ন, প্রগতিশীল চেতনার অভাব, অশিক্ষা, দারিদ্র্য ইত্যাদি সমাজের এই অসংগতির
জন্য দায়ী, যা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
উদ্দীপকে দেখা
যায় ওয়াসিকা নামের দুরন্ত এক কিশোরীর স্বপ্নালু জীবনকে দারিদ্র্য এবং নারীর প্রতি
নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা কীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। সে বন্ধুদের সাথে ছোটাছুটি
করত, আনন্দফুর্তি করত, অথচ তাকে বিয়ে দেওয়া হয় এক বৃদ্ধের
সাথে,
যা ওয়াসিকা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। গ্রামের লোকজন তার
স্বামীকে মানলেও ওয়াসিকা তার কথা মানে না। এমনই একটি চরিত্র 'লালসালু' উপন্যাসের জমিলা। সেও দুরন্ত কিশোরী।
কিন্তু নারীলোলুপ ভণ্ডপীর মজিদের লালসার শিকার হয়ে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়।
গ্রামের সবাই মজিদকে ভয়-ভক্তি করলেও জমিলা ভয় পায় না। প্রায়ই তার কথার অবাধ্য হয়।
উভয় চরিত্রের সাদৃশ্য এখানেই।
ঘ. উদ্দীপকের
একাব্বর মুন্সি 'লালসালু' উপন্যাসের মজিদ চরিত্রের সামগ্রিক দিক ধারণ করেনি। মন্তব্যটি যথার্থ।
সমাজে এমন কিছু
মানুষ বাস করে যারা তাদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য
যেকোনো হীন কাজ
করতে দ্বিধাবোধ করে না। প্রয়োজনে তারা ধর্মকেও
উদ্দীপকের
একাব্বর মুন্সি গ্রামের মাতব্বর। সবাই তাকে মান্য করে। তার কথা অনুযায়ী গ্রামের
অনেক কিছু নির্ধারিত হয়। কিন্তু সে বিয়ে করে তার মেয়ের বয়সী ওয়াসিকাকে, যা 'লালসালু' উপন্যাসে মজিদের জমিলাকে বিয়ে করার
বিষয়টি মনে করিয়ে দেয়। এই একটি বৈশিষ্ট্য ছাড়া একাব্বর মুন্সি চরিত্র উপন্যাসের
মজিদ চরিত্রের অন্য কোনো বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেনি। তাই বলা যায়, প্রশ্নের মন্তব্য যথার্থ।