পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র : ১ম অধ্যায়ের সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর/HSC civics 1st Part ( CQ-1)Ans.

HSC পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র : ১ম অধ্যায়ের সৃজনশীল প্রশ্নের  উত্তর (১-৫)


১ নং প্রশ্নের উত্তর

ক. Civitas শব্দের অর্থ 'নগররাষ্ট্র' (City State).

খ. নাগরিক ও নাগরিকের জীবনের সাথে যুক্ত সব বিষয় আলোচনা করে বলে পৌরনীতিকে নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান বলা হয়।

নাগরিক জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকার কার্যকলাপ নিয়ে পৌরনীতি অনুশীলন চালায়। নাগরিকের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনের সাথে যুক্ত ঘটনাবলি ও কার্যকলাপ এ শাস্ত্রে আলোচিত হয়। নাগরিক জীবনের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, নৈতিক তথা সার্বিক দিকের আলোচনা পৌরনীতির বিষয়বস্তু।

গ. উদ্দীপকের প্রথম বিষয়টি দ্বারা 'পৌরনীতি ও সুশাসন' কে বোঝানো হয়েছে। নাগরিক জীবনের সাথে সম্পর্কিত স্থানীয়, জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানের যে শাখা আলোচনা করে তাকে পৌরনীতি বলে। পৌরনীতি নাগরিক হিসেবে মানুষের অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি তাদের কার্যাবলি, অভ্যাস ও আচরণকেও বিশ্লেষণ করে। আবার রাষ্ট্র ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি পর্যালোচনার মাধ্যমে আদর্শ নাগরিক হবার শিক্ষা দান করে।

উদ্দীপকে দেখা যাচ্ছে, কামালের বাবা একজন সুনাগরিক। তিনি তার আদর্শে কামালকে গড়ে তোলার জন্য সুনাগরিকতা শিক্ষাদানের পাশাপাশি রাষ্ট্র সরকার, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা প্রদান ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন। কেননা, পৌরনীতির মূল বিষয়বস্তু হলো সুনাগরিকতার সুষ্ঠু শিক্ষাদান করা। ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ এবং উদার রাজনীতিবিদ লর্ড ড্রাইসের মতে, সেই ব্যক্তি সুনাগরিক যার মধ্যে বুদ্ধিমত্তা (Intelligence), আত্মত্মসংযম (Self Control) ও বিবেক (Conscience)একজন সুনাগরিকের চরিত্রে এ তিনটি গুণ বিদ্যমান থাকার ফলে তার মধ্যে অধিকার ও সচেতনতা সৃষ্টি হয়। তার মধ্যে জাতীয় ও সামাজিক স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের উর্ধ্বে স্থান দেওয়ার মানসিকতা গড়ে ওঠে। আর পৌরনীতির জ্ঞান লাভের মাধ্যমেই এসকল নাগরিক গুণ অর্জন করা সম্ভব হয়। সুতরাং, বলা যায়, সভ্য ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার যান্য একজন নাগরিকের পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ করা আবশ্যক।

ঘ. পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাসের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। পৌরনীতি ও সুশাসনের সাহায্য ছাড়া ইতিহাসের পথচলা যেমন কঠিন তেমনই ইতিহাসের সাহায্য ছাড়াও পৌরনীতি ও সুশাসনের পথচলা কঠিন। ইতিহাস মানবজাতির অতীতের স্মারকলিপি, সামগ্রিক জীবন-দর্পণ।

অন্যদিকে, পৌরনীতি ও সুশাসনের যে অংশ সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারের সাথে সম্পর্কিত সেসব ক্ষেত্রে ইতিহাসের সাথে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। এছাড়া এ দুটি শাঘ্রই পরস্পর পরস্পরকে পূর্ণতা প্রদান করেছে। ইতিহাসের তথ্য দ্বারা পৌরনীতি যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে ঠিক তেমনি পৌরনীতির জ্ঞান দ্বারা ইতিহাসও সঞ্জীবিত হয়েছে। একইসাথে পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচ্য বিষয়সমূহ যেমন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র প্রভৃতি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অতীতে কীরূপ ছিল, কীভাবে তা বিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপে পরিগ্রহ করেছে ইতিহাস পাঠ করলে তা জানা যায়। এমনকি ঐতিহাসিক তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ ব্যতীত পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনা অসম্পূর্ণ, আবার রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচিত না হলে ইতিহাসের আলোচনাও নিরর্থক হয়ে পড়ে।

ইতিহাস যেমন পৌরনীতি ও সুশাসনকে তার অন্তর্নিহিত সত্যের সন্ধান দেয়, তেমনি পৌরনীতি ও সুশাসন ইতিহাসের আলোচনাকে পরিপূর্ণতা দান করে। পৌরনীতি ও সুশাসন ছাড়া ইতিহাস পাঠ সার্থক হতে পারে না। পৌরনীতি ও সুশাসনের তথ্যগুলো পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক ঘটনাবলির ওপর আলোকপাত করে এবং ইতিহাসের স্বরূপ উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।

পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে উল্লিখিত বিষয়সমূহের প্রতি লক্ষ করলে দেখা যায়, ইতিহাস এবং পৌরনীতি ও সুশাসন পরস্পর পরিপূরক ও সহায়ক। উভয় শাস্ত্রের সাফল্য নির্ভর করে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর।

২ নং প্রশ্নের উত্তর

ক. সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে শাসনকাজ পরিচালনাই হচ্ছে সুশাসন।

খ. স্বচ্ছতা হলো এমন একটি বিমূর্ত ধারণা যা দ্বারা মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে, কোনো কর্মকাণ্ড কতটুকু নীতিসলত বা বৈধ। এককথায় স্বচ্ছতা হলো সুস্পষ্টতা। এটি সুশাসনের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। সরকারি কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর সুশাসন নির্ভর করে। তাই স্বচ্ছতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন সরকার তাদের কর্মকাণ্ড, নীতিমালা ও সিদ্ধান্ত জনগণকে অবহিত করতে পারবে।

গ. পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস উভয়ই সামাজিক বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। উভয়ের সম্পর্কও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নিম্নে পৌরনীতি ও ইতিহাসের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হলো পৌরনীতির জ্ঞান ছাড়া ইতিহাস যেমন অর্থহীন তেমনি ইতিহাসের তথ্য ছাড়া পৌরনীতির আলোচনাও অর্থহীন। এ কারণেই জন সিনী বলেছেন, পৌরনীতি ব্যতীত ইতহাস মূল্যহীন, আর ইতিহাস ব্যতীত পৌরনীতি ভিত্তিহীন। ইতিহাস অতীতের ঘটনাবলি, আন্দোলন, বিপ্লব সম্পর্কে আলোচনা করে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিবর্তন ও তত্ত্বসমূহ আলোচনা করে। আর যখন বিভিন্ন ঘটনাবলি ও ধারণাসমূহ পৌরনীতিতে আলোচনা করা হয়, তখন তাদের ঐতিহাসিক বিকাশ ধারাও বিবেচনা করতে হয়। এ কারণে বলা হয় ইতিহাস পৌরনীতির গবেষণাগার। নাগরিকের অতীতের ঘটনাবলি যেমন বর্তমানে ইতিহাস, তেমনি বর্তমানের ঘটনাবলিও ভবিষ্যতে ইতিহাসে পরিণত হবে। ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রভৃতি কোন আর্থ-সামাজিক পরিবেশে সংঘটিত হয়েছে, ইতিহাস তা জানতে সাহায্য করে। পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস একে অপরের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে। ঐতিহাসিক তথ্য ও সাক্ষ্য প্রমাণ ব্যতীত পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনা সম্পূর্ণ হয় না। তেমনি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচিত না হলে ইতিহাসের আলোচনা নিরর্থক হয়ে পড়ে। পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস একে অপরকে পূর্ণতা দান করে। ইতিহাস প্রদত্ত তথ্য, ঘটনাবলির দ্বারা যেমন পৌরনীতি ও সুশাসন পূর্ণতা লাভ করে। ঠিক তেমনি পৌরনীতির জ্ঞান দ্বারা ইতিহাসও সমৃদ্ধি লাভ করে।


ঘ.বর্তমানে পৌরনীতি স্থানীয়, জাতীয় বিষয় পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃতি লাভ করেছে। উদ্ভিটি যথার্থ।

পৌরনীতি ও সুশাসন মূলত নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান। নাগরিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত সবকিছু পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচ্য বিষয়। নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান হিসেবে পৌরনীতি শুধুমাত্র নাগরিকের স্থানীয় ও জাতীয় বিষয় নিয়েই আলোচনা করে না, বরং এটি নাগরিকের আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিকেও পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

নাগরিক জীবন আজ স্থানীয় ও জাতীয় গণ্ডির সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছে। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই বর্তমানে প্রতিবেশী ও দূরের সব রাষ্ট্রের সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করে বিশ্ব শান্তি ও বন্ধুত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করার জন্যই গড়ে তুলেছে জাতিসংঘসহ অন্যান্য বহু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। পৌরনীতি ও সুশাসন জাতিসংঘসহ অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব, বিকাশ, উদ্দেশ্য S কার্যাবলি সম্পর্কে আলোচনা করে। ফলে এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে মানুষের আচরণ ও কার্যাবলি কীরূপ হওয়া উচিত তা জানতে পৌরনীতি ও সুশাসন সাহায্য করে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় তা নিয়ে পৌরনীতি ও সুশাসন আলোচনা করে থাকে। অতীতে দু'দুটি বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে বিশ্বশান্তি বিনষ্ট করেছে, বিশ্বের শান্তিকামী নেতাগণ কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ, জাতিসংঘ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তুলেছে এবং এসব সংগঠন বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় কী ভূমিকা পালন করছে, পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ করে তা জানা যায়। উপরের আলোচনা থেকে বলা যায় যে, বর্তমানে পৌরনীতির আলোচনা শুধুমাত্র স্থানীয় ও জাতীয় বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বর্তমানে এটি স্থানীয় ও জাতীয় বিষয় পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

৩ নং প্রশ্নের উত্তর

ক. পৌরনীতি হলো সামাজিক বিজ্ঞানের একটি শাখা, যা নাগরিকতার সাথে সম্পৃক্ত সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করে।

খ.

সমাজবদ্ধ মানুষের নাগরিক জীবনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রথা, আইন, আচার-অনুষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে গড়ে উঠেছে। সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা সমাজ ও নাগরিকতার সাথে জড়িত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। পৌরনীতি একটি নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান হিসেবে নাগরিকতার সাথে জড়িত স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। তাই পৌরনীতিকে একটি অন্যতম সামাজিক বিজ্ঞান বলা হয়।

গ.

উদ্দীপকের মারুফের মধ্যে পৌরনীতি ও সুশাসনের জ্ঞানের অভাব পরিলক্ষিত হয়। তাই মারুফের বাস্তব জীবনে পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের জ্ঞান অপরিহার্য।

পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান। এটি নাগরিকের স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকে। নাগরিকতার অর্থ ও প্রকৃতি, নাগরিকতা অর্জন ও বিলোপ, সুনাগরিকতা, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যবোধ প্রভৃতি পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচ্য বিষয়। একজন নাগরিক স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন- ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন প্রভৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে। পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকের এ সকল স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি, গঠন, কার্যাবলি ও বিকাশ নিয়ে আলোচনা করে। এছাড়াও পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিকতার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে আলোচনা করে থাকে। পৌরনীতি ও সুশাসনের এসকল আলোচনা নাগরিকদের সুনাগকিতার গুনাবলি, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যবোধের শিক্ষা দিয়ে সুস্থ, সুন্দর জীবন গঠনের শিক্ষা দান করে। নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গি উদার করে, সংকীর্ণতা দূর করে। পৌরনীতি ও সুশাসনের পাঠ নাগরিক চেতনা বৃদ্ধি করে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগঠনে সহায়তা করে। নাগরিকদের সামনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ের দিগন্ত উন্মোচন করে। ফলে নাগরিকদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পায়। দেশপ্রেমের শিক্ষাও পৌরনীতি ও সুশাসনের পাঠ থেকে লাভ করা যায়। সর্বোপরি পৌরনীতি ও সুশাসনের শিক্ষা রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

উদ্দীপকের মারুফ রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে উক্ত বিষয়গুলোর সাথে সম্পৃক্ত। তাই তার বাস্তব জীবনে সুনাগরিকতার শিক্ষা, নাগরিকের স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রূপ, নাগরিক চেতনা বৃদ্ধি ও দেশপ্রেম সৃষ্টিতে পৌরনীতি ও সুশাসনের শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ঘ. উদ্দীপকের মারুফ সাহেবের মধ্যে পৌরনীতি ও সুশাসনের জ্ঞানের অভাব রয়েছে। তাই আদর্শ চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য মারুফ সাহেবের পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ করা উচিত।

পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকতা বিষয়ক সামাজিক বিজ্ঞান। নাগরিকতার সাথে জড়িত সকল বিষয় পৌরনীতি ও সুশাসন আলোচনা করে থাকে। পৌরনীতি ও সুশাসনের এ সকল পাঠ নাগরিকদেরকে সুনাগরিকতার গুণাবলি সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায় পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ থেকে। একজন নাগরিক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান যেমন- ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন প্রভৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট। পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকের সাথে সংশ্লিষ্ট এ সকল প্রতিষ্ঠানের  প্রকৃতি, গঠন, কার্যাবলি, বিকাশ নিয়ে আলোচনা করে। এ সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে নাগরিকদের সম্পর্ক কেমন হবে তাও পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের মাধ্যমে জানা যায়।

উদ্দীপকের মারুফ সাহেব একজন নির্বাচিত চেয়ারম্যান হলেও তিনি নাগরিক ও নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে জানেন না। ফলে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনে তিনি যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হন। মারুফ সাহেবের এই সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার কারণ হলো পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ে তার কোনো ধারণা বা জ্ঞান নেই। তাই মারুফ সাহেবের এই সমস্যা থেকে উত্তরণ ও আদর্শ চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়টি পাঠ করা উচিত। কেননা পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের মাধ্যমে নাগরিকের অধিকার-কর্তব্য এবং বিভিন্ন স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়।

৪ নং প্রশ্নের উত্তর

ক. ল্যাটিন শব্দ ঈরারং এর অর্থ নাগরিক।

খ. পৌরনীতি ও অর্থনীতি দুটি স্বতন্ত্র বিষয় হলেও এদের বিচ্ছিন্ন করে দেখার অবকাশ নেই।

কারণ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সরকারের রূপ অর্থনৈতিকব্যবস্থার দ্বারা নির্ণয় করা হচ্ছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, পুঁজিবাপ, সমাজবাদ ও মিশ্র অর্থনীতির মাধ্যমে পুঁজিবাদী সমাজবাদী ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। দেশের আইন, স্বাধীনতা ও সাম্যের ধারণা ও অবস্থান, শিল্প, বাণিজ্য, উৎপাদন, বণ্টন ও ভূমি ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এভাবেই পৌরনীতি ও অর্থনীতি পরস্পর সম্পর্কিত।

গ. উদ্দীপকে শাহানা বেগমকে অধিকার ও কর্তব্য সচেতন করার পেছনে পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের পাঠ মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য কিছু কিছু সুযোগ-সুবিধা বা অধিকার একান্ত প্রয়োজন। পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের ফলে নাগরিকগণ তাদের এসব সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সম্পর্কে অবহিত ও সচেতন হতে পারে। আবার অধিকারের ধারণার মধ্যেই কর্তবের S ধারণা নিহিত থাকে। প্রত্যেক নাগরিককে তার কর্তব্য কী কী, কেন কর্তব্য পালন করতে হয়, অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে সম্পর্ক কী এসব সম্পর্কে জানতে হয়। পৌরনীতি ও সুশাসন এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে এবং ব্যক্তিকে অধিকার উপভোগের পাশাপাশি কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করে। উদ্দীপকের লক্ষ করা যায়, শাহানা বেগম গত সংসদ নির্বাচনে উপযুক্ত প্রার্থীকে ভোট প্রদান করেছেন। তিনি তার সন্তানদের এবং পাড়াপড়শীদের ভোটদানে আগ্রহী করে তুলেছেন। অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে অবগত শাহানা বেগম দেশ ও জাতির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত আছেন। যেহেতু পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করে নাগরিককে সুনাগরিকতার শিক্ষা দান করে সেহেতু বলা যায় উদ্দীপকে শাহানা বেগমকে অধিকার ও কর্তব্য সচেতন করার পেছনে পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের পাঠ মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

ঘ. উদ্দীপকে সুনাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য সচেতন করার ক্ষেত্রে যে বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে তাহলো 'পৌরনীতি ও সুশাসন, যার পরিধি ব্যাপক।

পৌরনীতি ও সুশাসন হলো নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান। তবে ব্যক্তির নাগরিকজীবন ছাড়াও রয়েছে সমাজজীবন। মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে কেবল রাষ্ট্রের সদস্যই নয় বরং একই সাথে বহু সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য। এজন্য পৌরনীতি ও সুশাসন সমাজজীবনের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহ নিয়ে আলোচনা করে। পৌরনীতি ও সুশাসনের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হলো নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য। অধিকার কর্তব্য এবং অধিকার ভোগ করতে হলে কী কী কর্তব্য পালন করতে হয় তা পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের মাধ্যমে জানা যায়। পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকতার সাথে সম্পর্কিত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ, জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করে থাকে। পৌরনীতি ও সুশাসন বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ নিয়েও আলোচনা করে। রাষ্ট্র, সরকার নির্বাচন, রাজনৈতিক দল, জনমত প্রভৃতি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহও পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচ্য বিষয়।

এছাড়া পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকতার বর্তমান নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা করে। অতীতকালে নাগরিকতা কীভাবে নির্ণয় করা হতো, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য কেমন ছিল এবং বর্তমানে নাগরিকের মর্যাদা কীরূপ তার ওপর ভিত্তি করে পৌরনীতি ও সুশাসন ভবিষ্যৎ নাগরিক জীবনের ইঙ্গিত দান করে পরিশেষে বলা যায়, পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধি বা বিষয়বস্তু কেবল সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, আরও বহুবিধ বিষয় এ শাস্ত্রে আলোচিত হয়। তাই এ বিষয়ের পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত।

৫ নং প্রশ্নের উত্তর

ক. রাষ্ট্র এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন যার নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সংগঠিত সরকার, সার্বভৌমত্ব এবং কম অথবা বিপুল জনসমষ্টি রয়েছে।

খ. শব্দগত অর্থে পৌরনীতি হলো নগররাষ্ট্রে বসবাসরত নাগরিকদের আচরণ ও কার্যাবলি সংক্রান্ত বিজ্ঞান। পৌরনীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ ঈরারপং শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে দুটি ল্যাটিন শব্দ- Civis Civitas থেকে। Civis অর্থ 'নাগরিক', আর Civitas অর্থ 'নগররাষ্ট্র'। সুতরাং উৎপত্তিগত অর্থে নগররাষ্ট্র ও নগরবাসী সম্পর্কিত রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে জ্ঞানের যে শাখা গড়ে উঠেছে তাই পৌরনীতি। সংস্কৃত ভাষায় নগরকে 'পুর' বা 'পুরী' এবং নগরের অধিবাসীদের 'পুরবাসী' বলা হয়। আর পৌর হচ্ছে 'পুর' এর বিশেষণ যার অর্থ পুর বা নগর সংক্রান্ত বিষয়। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স, স্পার্টা ইত্যাদি ছিল এক একটি নগররাষ্ট্র। তবে বিশ্বের বর্তমান রাষ্ট্রগুলো প্রাচীন গ্রিসের 'নগররাষ্ট্রের' (City-State) মতো ছোট ও সরল নয়।

 গ. উদ্দীপকের বর্ণনা অনুযায়ী, তানভীর পৌরনীতি ও সুশাসনের প্রতি, আর রাশেদ অর্থনীতি বিষয়ের প্রতি আগ্রহী। পৌরনীতি ও সুশাসন হচ্ছে সামাজিক বিজ্ঞানের সেই শাখা যেখানে সরকারের সংগঠন ও পদ্ধতি, সংবিধান এবং নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি এটি নাগরিকের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে। অন্যদিকে, অর্থনীতি বা অর্থশাস্ত্র সামাজিক বিজ্ঞানের একটি শাখা, যা পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ, বিনিময়, বিতরণ, ভোগ ও ভোক্তার আচরণ এবং মানুষের অভাব ও বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সীমিত সম্পদ সম্পর্কে আলোচনা করে।

উদ্দীপকে দেখা যাচ্ছে, দুই বন্ধু তানভীর ও রাশেদ একই কলেজে দুটি ভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়ছে। রাষ্ট্র সরকার, সংবিধান, নাগরিক, আন্তর্জাতিক সংম্বা এগুলোর প্রতি তানভীরের আগ্রহ থাকায় সে পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়টি নিয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে মানুষ যেসব কাজ করে তার সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। আবার পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধি বা বিষয়বস্তু কেবল সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই  সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নাগরিকতার সাথে সম্পর্কিত সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে, মুদ্রা ব্যবস্থা, আয়-ব্যয়, বাজেট তৈরি, সম্পদের সুষম বণ্টন ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি রাশেদ বেশি আগ্রহী। এটি অর্থনীতি বিষয়টিকেই নির্দেশ করে। কেননা, অর্থনীতি নাগরিকদের অর্থ উপার্জন, অর্থ ব্যয় এবং সীমিত অর্থে কীভাবে বহুবিধ চাহিদা পূরণ করতে হয় সে সম্পর্কে জ্ঞান দান করে।


ঘ. হ্যাঁ, তানভীর ও রাশেদের মত আমিও মনে করি বিষয় দুইটি ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য অভিন্ন।

উদ্দীপকে উল্লিখিত পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতি বিষয় দুটি গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। উভয়ই সমাজবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। পৌরনীতি ও সুশাসনকে বলা হয় নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান, আর অর্থনীতিকে বলা হয় অর্থনীতি বিষয়ক বিজ্ঞান। পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকের অধিকার, দায়িত্ব, কর্তব্য, আচরণ, প্রত্যাশা প্রভৃতি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে। আর অর্থনীতি নাগরিকের সুবিধার্থে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। উভয়ের লক্ষ্য নাগরিকের কল্যাণ সাধন করা।

প্রতিটি রাজনৈতিক সমস্যার যেমন অর্থনৈতিক দিক রয়েছে, তেমনি প্রতিটি অর্থনৈতিক সমস্যার রয়েছে রাজনৈতিক দিক। তাই রাজনীতিবিদদের অর্থনৈতিক জ্ঞান এবং অর্থনীতিবিদদের রাজনৈতিক জ্ঞান থাকা দরকার। সমাজসেবা, সমবায়, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সম্পদের বণ্টন, উৎপাদন ইত্যাদি পৌরনীতি ও অর্থনীতি উভয় শাস্ত্রেই গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়। পৌরনীতি ও সুশাসন মূলত নাগরিককে অধিকার ও কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন করে। অন্যদিকে, অর্থনীতি মানুষের জীবনে অভাব ও চাহিদার মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করে সুন্দর ও সুখী জীবনযাপনে সহায়তা করে থাকে। এভাবে এ দুটি বিষয় নাগরিক জীবনকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার জন্য কাজ করে। একটি দেশের রাজনৈতিক সংগঠনের স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধি সে দেশের অর্থনৈতিক সংগঠনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। আবার কোনো দেশের আর্থিক উন্নতি ও অবনতি সমানভাবে সে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান কল্যাণমূলক রাষ্ট্রগুলো নাগরিকের সার্বিক মঙ্গলের লক্ষ্যে কর্মসূচি গ্রহণ করে। কর্মসংস্থান, মজুরি, সমবায় আন্দোলন, কর-খাজনা ইত্যাদি অর্থনৈতিক কাজগুলো রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। এদিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়,। পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতি প্রকৃতপক্ষে গভীরভাবে পরস্পর সম্পর্কিত দুটি বিষয়।

Post a Comment

Previous Post Next Post