লালসালু উপন্যাস সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর /Lalsalo CQ (2)

লালসালু উপন্যাস সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর (৬-১০ )

৬. নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

. খালেক ব্যাপারী মসজিদের বারআনা খরচ বহন করতে চায়।

খ. গ্রামে স্কুল স্থাপন করতে চাওয়া নব্যশিক্ষিত ছেলে আক্কাসের বিচার হবে ভেবে সভায় উপস্থিত হলেও যখন তেমন কোনো শাস্তি বিধান হলো না দেখে সবাই প্রথমে বিস্মিত হয়।

গ্রামের মানুষকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার জন্যে মহব্বতনগর গ্রামে একটি স্কুল স্থাপন করতে চেষ্টা করে। মজিদের কাছে ব্যাপারটি মোটেও ভালো লাগে না। সে এটাকে অমুসলিম কাজ বলে আক্কাসের বিচারের ব্যবস্থা করে। গ্রামের খালেক ব্যাপারীর বাড়িতে সভা বসে। সকলে তার শাস্তিবিধানের আশায় বসে থাকে। কিন্তু মজিদ যখন তাদের প্রত্যাশানুযায়ী শাস্তি ঘোষণা করে না তখন সভার সকলে প্রথমে বিস্মিত হয়।

গ. উদ্দীপকের মতি মাস্টার 'লালসালু' উপন্যাসের নব্যশিক্ষিত প্রগতিশীল চেতনার আক্কাস চরিত্রের প্রতিনিধি।

শিক্ষার আলো যেখানে পৌঁছায়নি সেখান কোনো সুস্থ জীবন আশা করা যায় না। অথচ বাংলাদেশে এই অভিশাপটা সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এজন্যে আমাদের দেশ এতটা পিছিয়ে। 'লালসালু' উপন্যাসের ঔপন্যাসিক এই বিষয়টি আন্তরিকতার সাথে বাস্তবমুখী করে উপস্থাপন করেছেন।

উদ্দীপকে দেখা যায় নিরক্ষর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি গ্রামের মতি মাস্টার আপ্রাণ চেষ্টা করে মানুষের মধ্য থেকে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে দূরীভূত করতে। সে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করে তারা যে চেতনা নিয়ে এতদিন বেঁচে আছে সেটা ঠিক নয়। ভন্ডপীর খাদেমদের চেতনার বলয় থেকে সহজ সরল মানুষদের বের করার প্রয়াস পেয়েছে। এমনই একটা চরিত্র 'লালসালু' উপন্যাসের আক্কাস চরিত্র। সেও গ্রামের সাধারণ মানুষদের নিরক্ষরতার হাত থেকে মুক্ত করার জন্যে একটি স্কুল স্থাপন করতে চায়। কিন্তু ভন্ড ধর্মব্যবসায়ী মজিদ স্বার্থহানির আশায় তার সেই মহতি চেষ্টাকে সফল হতে দেয় না। উদ্দীপকের মতি মাস্টার এবং উপন্যাসের আক্কাসের সাদৃশ্য এক্ষেত্রেই দেখা যায়। ঘ. "উদ্দীপকটি 'লালসালু' উপন্যাসের মাত্র একটি ভাবকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে।" মন্তব্যটি যথার্থই হয়েছে। শিক্ষা মানুষের অমূল্য সম্পদ। শিক্ষা ছাড়া জীবনের কোনো সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সত্যকে মনের মধ্যে ধারণ করে উপন্যাসের আক্কাস গ্রামে একটা স্কুল স্থাপন করে মানুষের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে একটু আলোর পরশ দিতে চিয়েছিল কিন্তু এ ধর্মান্ধ সমাজ সেটা হতে দিল না। 'লালসালু' উপন্যাসের এই দিকদিই উদ্দীপকে উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে দেখা যায় পীর বা আল্লাহর অলিদের বিশ্বাস না করার জন্যে মতি মাস্টারকে তিরস্কার করে। জমির ব্যাপারী পীরের বদ দোয়ায় ছাই হয়ে যাবে এই কথাও তাকে শুনতে হয়। কিন্তু প্রগতিশীল চেতনার যুবক মতি মাস্টার সে কথা শুনে হাসে। মানুষের এই অন্ধবিশ্বাস দেখে তাদের প্রতি করুণা হয়। এদিকটি 'লালসালু' উপন্যাসের বহুমুখী ঘটনার মাত্র একটিমাত্র দিক। 'লালসালু' উপন্যাসে ঔপন্যাসিক জীবনাশ্রয়ী, বাস্তবমুখী অস্তিত্বের উন্মীলন ও পরাভব অঙ্কনের মধ্য দিয়ে এটিকে বাংলাদেশের অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ চেতনাকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। এখানে অশিক্ষা, ধর্মান্ধতা, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতারণা, সহজ সরল মানুষের জীবনধারা অসামান্য শৈল্পীক নৈপুণ্যে উপস্থাপিত হয়েছে। যা উদ্দীপকে সম্পূর্ণভাবে উঠে আসেনি, শুধু শিক্ষার আলো বঞ্চিত গ্রামে আক্কাস যুবকের শিক্ষার আলো ছড়ানোর চেষ্টা করার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাই বলা যায় প্রশ্নের মন্তব্য যথার্থ।

৭. নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

ক. গ্রামে স্কুল বসাতে চায় আক্কাস।

খ. 'তোমার দাড়ি কই মিয়া?' উক্তিটি করে মাজারের খাদেম মজিদ।

আক্কাস শহর থেকে লেখাপড়া শিখে গ্রামে যায়। গ্রামের মানুষকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে সে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু ধর্মব্যবসায়ী মজিদ নিজের স্বার্থহানির ভয়ে এ প্রস্তাবে বাঁধ সাথে। ধর্মের দোহাই দিয়ে আক্কাসকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। বিচার সভায় মজিদ আক্কাসকে অপ্রতিভ করতে কৌশলে তার প্রতি ধর্মীয় অনুভূতির উক্ত কথাটি দ্বারা ঘায়েল করে। যাতে আক্কাস অপ্রতিভ হয়ে পড়ে। তার মুখে কোনো কথা যোগায় না। 

গ. উদ্দীপকটি 'লালসালু' উপন্যাসে উপস্থাপিত ধর্মব্যবসায়ী ও প্রগতিশীল তরুণের চেতনার সাথে দ্বন্দ্বের বিষয়টির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ধর্ম মানুষের মুক্তির পথ দেখায়। কিন্তু সেটা যদি অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মব্যবসায়ীদের চেতনার ওপর নির্ভর করে তবে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। উদ্দীপকে এবং 'লালসালু' উপন্যাসে এ বিষয়টি লক্ষ করা যায়।

উদ্দীপকে দেখা যায় মোল্লা ও তরুণের মাঝে দ্বন্দ্বের চিত্র। লেখক এর কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছেন। মোল্লা অর্থাৎ ধর্মের ধ্বজাধারীরা তরুণদের প্রগতিশীল চেতনাকেই ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। তাদের মতে য্য নতুন তাই অনৈসলামিক।

এমন দ্বন্দ্বমূলক ভাব লক্ষ করি 'লালসালু' উপন্যাসে ধর্মব্যবসায়ী মজিদ ও প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী তরুণ আক্কাসের মাঝে। আক্কাসের স্কুল করার প্রস্তাব সে গ্রহণ করতে পারে না। ধর্মের ধুয়া তুলে সেটাকে বন্ধ করে গ্রামে পাকা মসজিদ নির্মাণের সিন্ধান্ত নেওয়া হয়। উপন্যাসের এই দ্বন্দ্বমূলক ভাবের সাথে উদ্দীপকটি সাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. "উদ্দীপকের মোল্লাদের এবং 'লালসালু' উপন্যাসের মজিদের চেতনাগত বৈশিষ্ট্য একই।" মন্তব্যটি যথার্থ।

নতুন কিছু করতে গেলে বাধা আসে এটা চিরন্তন সত্য। সেটি যদি কোনো প্রগতিশীল চেতনার ধারক হয় তবে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে সঠিকভাবে গ্রহণ করবে না এটাই স্বাভাবিক। উদ্দীপকে এমন বিষয়েরই অবতারণা ঘটেছে। যা উপন্যাসে উপস্থাপিত ভাবের সাথে একাতাতা ঘোষণা করেছে।

উদ্দীপকে লক্ষ করা যায় মোল্লা ও তরুণের মধ্যে বিরোধের চিত্র। মোল্লার চেতনা যে নতুন মাত্রই অনৈসালামিক। তাদের বিশ্বাস নতুন কিছু আসলেই ইসলামকে কিছু-না-কিছু ক্ষতি করে যাবে। এই বুদ্ধি তাদের এক মস্তবড় দুর্বলতা ও কাপুরুষতা। এই মোল্লার চেতনাগত বৈশিষ্ট্য লক্ষ করি উপন্যাসের মজিদ চরিত্রে।

উপন্যাসে মজিদের চেতনাতে লক্ষ করা যায় ধর্মান্ধতা, কাপুরুষতা, স্বার্থান্বেষী এবং শঠতা। সে ধর্মকে জীবিকা হিসেবে ব্যবহার করেছে। সমাজে সকল প্রগতিশীলতা ও নতুনত্বের সে ঘোর বিরোধী। তাইতো আক্কাস গ্রামে স্কুল দিতে চাইলে সে বিরোধিতা করে। খালেক ব্যাপারীর বৌকে তালাক দিতে বাধ্য করে। স্কুলের পরিবর্তে গ্রামে সে পাকা মসজিদ তৈরি করার প্রস্তাব করে এবং সিন্ধান্ত নেয়। ধর্মের নামে সবখানেই সে অনাচার করে। তাই বলা যায় উদ্দীপকের মোল্লা এবং মজিদের চেতনাগত বৈশিষ্ট্য একই।

৮. নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

ক. পীর সাহেবের আগমন ঘটে আওয়ালপুর গ্রামে।

খ.নবাগত পীর সাহেবের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে ভন্ডামী আখ্যা দিয়ে উক্তিটি করেছে মজিদ।

আওয়ালপুর গ্রামে হঠাৎ একজন পীরের আগমন ঘটে। কৌতূহলবশত মজিদও সেখানে যায়। সেখানে গিয়ে মজিদ পীর সাহেবের জনপ্রিয়তা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। তাকে কেউ সেখানে গ্রাহ্য করে না। এমনকি যারা তাকে চেনে ভক্তি করে তারাও সেদিন তার দিকে ফিরে তাকায় না। পীরের নানা কেরামতির কথা সে শুনতে পায় তারপর যখন সে দেখে অসময়ে নামাজ পড়তে পীর সাহেব হুকুম দিয়েছে তখন সে সুযোগ কাজে লাগায়। সে পীরের কেরামতির অসারতা প্রমাণের জন্যে উক্ত উক্তিটি করে।

গ. উদ্দীপকটি 'লালসালু' উপন্যাসে বর্ণিত পীর সাহেবের আগমনের ঘটনাটির প্রতি ইঙ্গিত করেছে।

ধর্মভীরু মুসলিম সমাজে পীর আউলিয়াদের একটি বিশেষ স্থান আছে। তাদের মধ্যে সকলেই সৎ ও নিষ্ঠাবান নয়। 'লালসালু' উপন্যাসে এ  বিষয়টি লেখক চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন যা উদ্দীপকেও লক্ষ করা যায় ।

'লালসালু' উপন্যাসে তেমনই একজন ভন্ড পীরের কথা বলা হয়েছে। জনৈক পীর সাহেব এর তার সাগরেদের আগমন ঘটে আওয়ালপুর গ্রামে। কারণ তখন সেখানকার গৃহস্তের গোলায় ধান উঠেছে। মুরিদ মতলুব খাঁ তার চারপাশে লোকে লেকারণ্য থাকে। সেই লোকজনদের মধ্যে মুরিদ মতলুব খাঁ পীর সাহেবের গুণাগুণ বর্ণনা করে সহজ ভাষায়। সে নাকি সূর্যকেও দাঁড় করিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। এমনই এক দৃশ্যের অবতারণা ঘটেছে উদ্দীপকে। একই পীর তার অবস্থাসম্পন্ন মুরিদের বাড়ি আস্তানা গেড়ে মুরিদসহ ধর্মপ্রাণ মানুষদের কেরামত দেখায়। যতটা না তার ক্ষমতা তার থেকে বেশি ক্ষমতা তার সাগরেদদের। উদ্দীপকটি 'লালসালু' উপন্যাসে বর্ণিত ভাবটির প্রতিই ইঙ্গিত করেছে। 

ঘ. না, উদ্দীপকটি 'লালসালু' উপন্যাসের সম্পূর্ণ ভাব ধারণ করে না। নিরস্তিত্বের জীবন বেদনা ও উত্তরণ প্রয়াসের শিল্প রূপায়ণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর 'লালসালু' এক অভিনব সৃষ্টি। বুর্জোয়া সমাজের সকল সংকটের প্রেরণায় নিঃসঙ্গ আত্মসন্ধানী জীবন চেতনা নিয়ে ঔপন্যাসিক তাঁর শিল্পীমানস গঠন করে উপন্যাসের জমিনে তার স্বার্থক রূপ দিয়েছেন। এসব চেতনার সম্পূর্ণ প্রকাশ ঘটেনি উদ্দীপকের স্বল্পতম জমিনে।

উদ্দীপকে শুধু এক ধর্মান্ধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অশিক্ষিত সমাজে ভন্ড ধর্মব্যবসায়ীর স্বার্থসিদ্ধর পন্থাস্বরূপ মানুষের সাথে প্রতারণার বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। সমাজের ধর্মব্যবসায়ীরা কীভাবে সাধারণ সহজ সরল মানুষ ঠকিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে জনৈক পীরের মাধ্যমে সে দৃশ্যই দেখানো হয়েছে উদ্দীপকের এ বিষয়টি 'লালসালু' উপন্যাসের অনেক বিষয়ের মধ্যে একটি মাত্র বিষয়।

'লালসালু' উপন্যাসে বহুমুখী ভাবের প্রকাশ ঘটেছে। এদের আর্থ- সামাজিক কাঠামোর মধ্যে জীবন প্রবাহের গতিময়তা, স্থবিরতাঅশিক্ষা-কুশিক্ষা, কুসংস্কার, সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য: ধর্মভীতি, মানুষের নেতিবাচক মূল্যবোধ-ধর্মের ধ্বজাধারীদের ভন্ডামী ও প্রতারণা, নিরক্ষর অসহায় মানুষের তাদের কাছে আত্মসমর্পণ প্রভৃতি জীবনমুখী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে উপন্যাসে। যা উদ্দীপকে পরিলক্ষিত হয় না শুধু সমাজের ভন্ড ধর্মব্যবসায়ীর কর্মকান্ডের বিষয় ছাড়া। তাই বলা যায় উদ্দীপকটি 'লালসালু' উপন্যাসের ভাবার্থের দর্পণ নয়।

৯. নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

ক. হাসপাতালটি করিমগঞ্জে অবস্থিত।

খ. ধলা মিঞা আওয়ালপুরের পীরের কাছে গিয়ে পানিপড়া আনার ব্যাপারে প্রবল অনিচ্ছুক যদিও সে সেটা মুখে স্বীকার করে না। ধলা মিঞা খালেক ব্যাপারীর সম্বন্ধী- খালেক ব্যাপারীর দ্বিতীয় স্ত্রী তানু বিবির বড় ভাই। সে তার ভগ্নিপতির গৃহেই আশ্রিত। কাজকর্ম করে না। বসে বসে খায়। খালেক ব্যাপারী তাকে টাকা পয়সা দিয়ে যখন গোপনে কাজটা করে দেওয়ার দায়িত্ব দেয় তখন সে সেটা গ্রহণ করে কিন্তু তিনটা কারণে করে না।

প্রথম কারণ, সে অলস কাজকর্ম করার ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নেই; কোন ভাবে সেটা ফাঁকি দেওয়া যায়, সে সেটা ভাবে। 

দ্বিতীয় কারণ, আওয়ালপুরের মানুষের সাথে মহব্বতনগরের গ্রামবাসীর ইতঃপূর্বে মারপিট হয়েছে, পানিপড়া আনতে গেলে সে আবার মার খাবে কিনা এই ভয় সে পায়। 

তৃতীয় কারণটিই সবচেয়ে বড়। দুই গ্রামের মাঝেখানে থাকা ভুতুড়ে মন্ত তেঁতুল গাছটাকে। তাই তার এই অনিচ্ছা। 

গ. 'লালসালু' উপন্যাসের রহিমা এবং উদ্দীপকের হাসনা বানু চরিত্র দুটির মধ্যে মিল এবং অমিল দুটি দিকই লক্ষণীয়। মিল খুব কম, অমিলই বেশি। প্রথমে মিলের ক্ষেত্রটি আলোচনা করা যাক, পরে দৃষ্টিপাত করা যাবে অমিলের অংশে। মিল হচেছ রহিমা এবং হাসনা বানু উভয়েই নিঃসন্তান। বিয়ের পরেও তাদের সন্তানাদি হয়নি এবং তাদের উভয়ের স্বামীই দ্বিতীয় বিয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

অমিলের জায়গাটি ব্যাপক এবং বিচিত্র। রহিমা তার স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহ নির্বিচারে মেনে নিয়েছে কোনো রকম প্রতিবাদ প্রতিরোধ ছাড়াই এমনকি কোনো রকম প্রশ্নও তার মধ্যে উচ্চারিত হয়নি। সে সন্তানহীনতার জন্যে আসলে দায় কার। অন্য দিকে, হাসনা বানু রহিমার মতো নিঃশর্তে স্বামীর কাছে সমর্পণ করেনি। সে যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করে জানতে চেয়েছে যে, তাদের সন্তানহীতার জন্য দায়ী কে? সে ডাক্তারি পরীক্ষার আয়োজন করার আহ্বান করেছে। কিন্তু বলাবাহুল্য, তার স্বামী আবুল মিয়া তার এই দাবির প্রতি কর্ণপাত করে নি। ফলে পারিবারিক কলহ অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

পুরুষশাসিত বাঙালি সমাজে এটা মনে করা হয়ে থাকে যে, সমস্যা মূলত নারীর দিক থেকেই হয়- পুরুষের সমস্যা নেই। রহিমা স্বামীপ্রাণা, পতিভক্ত সনাতন ঘরানার নারী; অন্যদিকে হাসনা বানু যুগের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তিত বাঙালি নারী যে তার অধিকারের ব্যাপারে সচেতন। হাসনা বানুর পতিভক্তি নেই, এমন কথা কিন্তু উদ্দীপকে ইঙ্গিত করা হয়নি কিন্তু যেখানে তার অধিকার ধূলিতে লুটিয়ে যাচ্ছে, সেখানে সে হয়তো সনাতন কোমল আদর্শ ছেড়ে কঠিন মূর্তিতেই আবির্ভূতা।

ঘ. লেখক হচ্ছেন তাঁর সমকালীন দেশ-কালের নিপুণ রূপকার। তাই সাহিত্যই হচ্ছে সবচেয়ে কালের নির্ভরযোগ্য ইতিহাস। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর সময়ের কথা বলেছেন, সেটা বিশ শতকের প্রথমার্ধ কিন্তু উদ্দীপকের শুরুতেই দেখা যাচ্ছে সময়টা একুশ শতকের প্রথমার্ধ।একশো বছরে সময় অনেক বদলে গেছে, বদলে গেছে সমাজের কাঠামো, বদলে গেছে সেই সমাজের মানুষগুলো। তাই 'লালসালু' উপন্যাসের রহিমা আর উদ্দীপকের হাসনা বানু ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি।

বিশ শতকের প্রথমার্ধের চরিত্র রহিমা স্বামীর অনুগত। মজিদ যখন দ্বিতীয় বিয়ে করার আগ্রহ প্রকাশ করে, রহিমা বিনা দ্বিধায় তা মেনে নেয়। সে প্রশ্ন তোলে না যে তাদের যে ছেলেপুলে হচ্ছে না, এর জন্য আসলে দায়ী কে? অন্যদিকে একুশ শতকের প্রথমার্ধের ঠিক একশো বছরের পরের চরিত্র হাসনা বানু একই অবস্থায় পড়ে ডাক্তারি পরীক্ষা করতে বলে যে আসলে সমস্যাটি কার তার নিজের, নাকি তার স্বামীর; কার জন্যে হচ্ছে না তাদের সন্তান? হাসনা বানু নিশ্চিত হতে চায়, সমস্যা যদি হাসনা বানুর দিক থেকেই হয়ে থাকে, তাহলে আবুল মিয়া বিয়ে করুক। আবুল মিয়া এতে রাজি নয় বলেই বিবাদের সূচনা।

দুজনের সামাজিক বাস্তবতার ভিন্নতার জন্য সময়ের পরিবর্তন একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। রহিমা এবং হাসনা বানুর মাঝে একশো বছরের ব্যবধান। সময় মানুষকে নির্মাণ করে ভিন্ন ভিন্ন রকম করে। চরিত্রের ওপর সময়ের একটা ভূমিকা থাকে, যেটা এই দুটি চরিত্রের ওপর প্রবলভাবে ছায়াপাত ঘটিয়েছে।

দুজনের সামাজিক বাস্তবতার ভিন্নতার জন্য সমাজের পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। রহিমা গ্রামীণ সমাজের প্রতিনিধি। তার বাড়ি মহব্বতনগর গ্রামে। অপরদিকে, হাসনা বানু নগর জীবনের প্রতিনিধি। তার বাড়ি ঢাকার অদূরে কালাচানপুরে। তাই তাদের বাস্তবতা

ভিন্ন হতে বাধ্য।

১০ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

ক. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর পিতার নাম সৈয়দ আহমদউল্লাহ।

খ মজিদের দ্বিতীয় বিবাহের আগ্রহের কারণ ছিল অল্পবয়সী কোনো নারীর সঙ্গ লাভ।

মজিদের দ্বিতীয় বিয়ের উদ্দেশ্য মূলত অল্পবয়সী একজন নারীর সঙ্গ লাভের গোপন বাসনা থেকে উৎসারিত যদিও সে তা মুখে স্বীকার করেনি। সে মুখে বলেছে যে রহিমাকে একজন সঙ্গী এনে দেওয়াই তার কাজ। রহিমা নিঃসন্তান। অনেক বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরেও তার কোনো সন্তান হয়নি। এটি কার দোষে রহিমার না মজিদের সেটি কিন্তু ডাক্তারি পরীক্ষায় নির্ণীত হয়নি। তবু মজিদ নিজেই ধার্য করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেমনটি করা হয়ে থাকে সব দোষ রহিমারই। তাই সে অজুহাত দেখিয়ে রহিমাকে বলে "বিবি, আমাগো যদি পোলাপাইন থাকতো।" রহিমা হাসুনিকে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব দিলে মজিদ রাজী হয় না। সে আসলে খুব কম বয়সী একটি মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। লেখক স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন: "মজিদের নেশার প্রয়োজন।"

গ. 'লালসালু' উপন্যাসের রহিমা এবং উদ্দীপকের শামীমা সুলতানা চরিত্র দুটির মধ্যে মিল এবং অমিল দুটি দিকই লক্ষযোগ্য।

প্রথমে আমরা মিলের দিকগুলো আলোচনা করবো, পরে আলোকপাত করা হবে অমিল যেখানে আছে সেসব দিকে। মিল এই যে, রহিমা এবং শামীমা সুলতানা দুজনই প্রথম পর্যায়ে স্বামীর অনুগত এবং দুজনই গ্রামীণ, কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রতিনিধি। (যার কারণেই হোক) রহিমা এবং শামীমা সুলতানা দুজনই নিঃসন্তান এবং দুজনই স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়েতে অনুমতি দিয়েছে হয়তো মনে কষ্ট চেপে রেখেই, সাধারণত এসব ক্ষেত্রে যা হয়ে থাকে। এই দুজন নারী তাদের স্বামীদের দ্বিতীয় বিবাহ পর্যন্ত এক রকম। 

তাদের মধ্যে অমিল শুরু হলো তাদের স্বামীরা যখন বিয়ে করে, তারপর থেকে। রহিমার ক্ষেত্রে যদি লক্ষ করি, তাহলে স্পষ্ট হবে যে, জমিলার ওপর মজিদ যখন থেকেই অত্যাচার করা শুরু করেছে, তখন থেকেই রহিমা ধীরে ধীরে স্বামীর অবাধ্য হতে শুরু করেছে এবং তার অবাধ্যতা উপন্যাসের শেষে চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যখন সে মজিদকে বলে, "ধান দিয়া কী হইবো, মানুষের জান যদি না থাকে? আপনে ওরে নিয়া আসেন ভিতরে।" অপরদিকে শামীমা সুলতানা স্বামীকে দ্বিতীয় বিবাহের অনুমতি দিলেও সতীনের গর্ভে সন্তান জন্ম নেওয়ার পরে সে বদলে গেছে। তখন সে আর স্বামীর অনুগত থাকেনি। নিতান্ত অনুগত স্ত্রী হয়ে উঠেছে নিত্য কলহপরায়ণ। তবে রহিমার সাথে শামীমা সুলতানার মূল পার্থক্য একটিই, সেটি হচ্ছে: রহিমা তার সতীনকে কখনই ঈর্ষা করেনি শামীমা সুলতানা তার সতীনকে ঈর্ষা করেছে সে পুত্রসন্তান প্রসব করেছে।

ঘ. বিন্দার মধ্যে থাকতে পারে সিন্ধার ব্যঞ্জনা, গোষ্পদে তরঙ্গিত হয় সমুদ্র গর্জন- এটি কেবল কথার কথা নয়, বাস্তবেও এর অজস্র প্রমাণ রয়েছে। তার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্তমান উদ্দীপকের কথাই বলা যেতে পারে। এ উদ্দীপকের মাত্র ৫টি বাক্যে বিধৃত হয়েছে আবহমান বাঙালি সমাজের একটি রূপরেখা।

প্রকৃতিগত কারণে স্বামী বা স্ত্রীর যে কোনো একজনের ত্রটির জন্য সন্তান জন্ম নাও হতে পারে। এটি একটি নিত্যনৈমিত্তিক, স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু পুরুষশাসিত বাঙালি সমাজে বিশেষ করে গ্রামীণ অশিক্ষিত সমাজে ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়াই ধরে নেওয়া হয়। যে এটি ঘটেছে নারীর এটির কারণে। তখন পুরুষটি আবার বিয়ে করে। তার স্ত্রী এটি মেনে নেয় অথবা সমাজের কারণে মেনে নিতে বাধ্য হয়। উদ্দীপকে আমরা তাই দেখেছি: আলমাস আলী ও শাসীমা সুলতানার কোনো সন্তান হচ্ছে  না বলে আলমাস আলী দ্বিতীয় বার বিয়ে করেছে, শামীমা তাতে অনুমতি

দিয়েছে।

দ্বিতীয় স্ত্রী ঘরে আসার পর তার ঘরে সন্তান জন্ম নিল লক্ষণীয় 'পুত্র সন্তান' তখন প্রথম স্ত্রী শামীমা সুলতানা ঈর্ষার আগুনে দগ্ধ হয়েছে। এটি খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। উদ্দীপকে শামীমা সুলতানার সতীনের নাম উল্লেখ করা হয় নি। সতীনের ভূমীকায় শামীমা এবং শামীমার ভূমিকার সতীন থাকলেও প্রতিক্রিয়া একই হতো। একজনের সাজানো ঘরে অন্য একজন উড়ে এসে জুড়ে বসলে কার সহ্য হয়। শামীমারও সহ্য হয়নি। বাঙালি সমাজটাই এমন।

আবেগ, স্বার্থ ও উদারতা এই তিনটি জিনিস সমান্তরালে যেমন চলতে পারে তেমনই এর বিপরীতমুখী গতিও প্রায়ই লক্ষণীয়। তাই সংঘর্ষ সেখানে অনিবার্য। আলমাস আলীর দ্বিতীয় স্ত্রী শামীমা সুলতানার মতো বন্ধ্যা হলে হিসাব-নিকাশ অন্যরকম হতো।

Post a Comment

Previous Post Next Post