নিজের সফল ক্যারিয়ার গঠনে আপনার যা করণীয় ।Career building




Career building

ব্যক্তিগত উন্নয়নে নিজের সময়কে কাজে লাগাতে পারলে পেশাগত দিক দিয়ে আপনি অনেকের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন। নিজের মেধা এবং দক্ষতা নিজের মধ্যে লুকিয়ে না রেখে তার যথাযথ বিকাশ সাধন করতে হবে স্বীয় প্রচেষ্টাই।


সফল ক্যারিয়ার গড়তে একটি সুনিদ্রিষ্ট কাজের কিংবা বিভিন্ন পেশা সম্পর্কে যে ধরনের জ্ঞান থাকা দরকার, তা অনেকের মধ্যেই অনুপস্থিত। সফল কেরিয়ার গড়ে তুলতে আত্বসচেতনতা সৃষ্টি করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত উন্নয়নে নিজের সময়কে কাজে লাগাতে পারলে পেশাগত দিক দিয়ে আপনি অনেকের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন। নিজের মেধা এবং দক্ষতা নিজের মধ্যে লুকিয়ে না রেখে তার যথাযথ বিকাশ সাধন করতে হবে স্বীয় প্রচেষ্টাই। নিজের কর্মক্ষমতার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের মাধ্যমেই খুলে যেতে পারে জীবনে সফলতা লাভের বন্ধ দুয়ার।


নিজের সফল ক্যারিয়ার গঠনে আপনার যা করণীয়




১. লক্ষ্য নির্ধারণ
সফলতা পাওয়ার রাস্তা বেছে নেওয়ার আগেই ভেবে নিন আপনি এই যাত্রার শেষে কোথায় পৌঁছতে চান। কেননা কোনো কাজে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন সঠিক দিশা এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য। লক্ষ্য গুলিকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে নিতে হবে । প্রথম হবে স্বল্প মেয়াদী লক্ষ্য, যা একাডেমিক বা প্রফেশনাল গোল কে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিতে সাহায্য করবে। এবং দীর্ঘ মেয়াদী লক্ষ্য যা আপনার কেরিয়ারের গন্তব্য কে নির্দেশ করবে। স্বল্প মেয়াদী লক্ষ্যের ধাপে ধাপে বাস্তবায়নই একদিন আপনাকে পৌঁছে দেবে আকাঙ্খিত লক্ষ্যে।


২. দক্ষতা অর্জন
লক্ষ্য নির্ধারণের পর নজর দিতে হবে নিজের কর্মদক্ষতার প্রতি। নিজের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং কাজের গতি বাড়াতে প্রয়োজনীয় বিষয়ে ত্বাত্তিক ব্যবহারিক উভয় দিকে মনোযোগী হোন । প্রয়োজনে বেশি বেশি বই পড়ুন, ইন্টারনেটের সহায়তা নিন অথবা কোন কোর্সে ভর্তি হন যা আপনাকে আপনার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং আপনার কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে দেবে বহুগুণ। আপনাকে মনে রাখতে হবে সফল কেরিয়ার মানেই অধিক অর্থ বা একটি ভালো চাকুরি নয় , আপনার দক্ষতা গুলির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও মূল্যায়ন। তাই এটা খুব স্বাভাবিক যে আপনি যত বেশি দক্ষ হয়ে উঠবেন, আপনার সফলতার সম্ভাবনা তত অধিক হবে।


৩. কর্ম পরিকল্পনা
শুধু সঠিক লক্ষ্য এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকলেই হবে না, তার সঙ্গে দরকার আপনার কাজের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা। পরিকল্পনা গ্রহনের সময় তাড়াহুড়ো করা একেবারেই অগ্রহনযোগ্য। বরং এ ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয় মনোভাব পোষন সাফল্য লাভে অধিকতর কার্যকর হতে পারে। লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নির্ধারন করার পরের ধাপ স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহন করা। ধোঁয়াশাচ্ছন্ন নয়, পরিকল্পনা হতে হবে ক্যারিয়ার গঠনের পথ পরিক্রমার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সুনর্দিষ্ট, যথাযথ এবং অর্থবহ । এ ধাপে অন্তর্ভুক্ত থাকবে আগামী পাঁচ বছর বা দশ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চাই, কি করতে চাই, কিভাবে করতে চাই, কখন করতে চাই, ইত্যাদি। পরিকল্পনা গ্রহনের প্রাক্কালে যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন সেগুলো হল নিজের অবস্থান, নিজের বা পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থান, পারিবারিক প্রয়োজন এবং সমস্যা ইত্যাদি।



৪. সময়ের যথাযথ ব্যবহার
প্রতিদিনের কাজ, পড়াশুনা, দৈনন্দিন কর্তব্য এবং পূর্ব নির্ধারিত কর্ম পরিকল্পনা রুটিন মাফিক সম্পন্ন না করলে সময়ের অপচয় হতে পারে। আর সময়ের যথাযথ ব্যবহার না করলে পারলে, অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে দৈনন্দিন টার্গেট, চারিদিক থেকে ঘিরে ধরতে পারে হতাশা এবং ব্যর্থতার দুশ্চিন্তা। সময়ের কাজ যথা সময়ে না করে ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখাটা ক্যারিয়ারে সফলতা লাভের বিরাট অন্তরায়। এর থেকে পরিত্রানের জন্য দরকার সময়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। প্রতিদিনের পড়াশুনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম সম্পাদন একটা পরিকল্পনার মাধ্যমে করা একান্ত প্রয়োজন। সেই সাথে খেলাধূলা এবং সুস্থ বিনোদনের জন্য নির্দিষ্ট সময় সীমা বরাদ্দ করাও অত্যাবশ্যক।

৫. প্রায়োরিটি নির্ধারণ
সময় সদব্যবহার ছাড়াও যে বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে, তা হল প্রায়োরিটি নির্ধারণ করা এবং নিজের লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা করতে পারার ভিত্তিটাই হল অগ্রাধিকার নির্বাচন করা। ছেলে মেয়েরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়। ফলশ্রুতিতে সঠিক সময়ে সঠিক কাজ কিংবা সময়ের কাজ সময়ে করা কারো কারো পক্ষে কখনও কখনও সম্ভবপর হয় না। কখন ও বা ব্যক্তিগত কারণে নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যায়। কখনো বা পরিস্থিতির শিকার হয় তারা। সব সময় মনে রাখতে হবে প্রত্যেকটি মানুষের প্রায়োরিটি ভিন্ন। তাই স্থান-কাল পাত্র ভেবে নিজের প্রায়োরিটি গুলি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এমন কোন কাজে সময় অপচয় করা চলবে না যাতে আপনি আপনার পথ ভ্রষ্ট হন।

৬. চট জলদি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ
কঠিন পরিস্থিতিতে তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এক বিশেষ দক্ষতার মধ্যে পড়ে। পারিপার্শ্বিক সুযোগ-সুবিধা এবং পেশার সম্ভাবনার দিকগুলি বিবেচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ক্যারিয়ারে সফল হওয়ার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।

৭. হতাশাগ্রস্থ না হওয়া

হতাশা থেকে মানুষের মধ্যে আস্তে আস্তে নিজের উপর অনাস্থা বৃদ্ধি পেতে থাকে, স্বীয় মেধা এবং পারদর্শীতা নিয়ে নিজের মধ্যেই প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। ফলে মানুষের স্বাভাবিক আচরন থেকে শুরু করে জীবনযাপনে লক্ষ্য করা যায় ব্যাপক পার্থক্য। অতিরিক্ত হতাশা মানুষকে ক্রমশঃ অপরাধপ্রবনতা এমনকি আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়। নির্দিষ্ট সময়ে কাঙ্খিত অবস্থানে পৌছাতে না পারলেও হাল ছেড়ে দেওয়াটা চরম বোকামি। বরং বারংবার প্রচেষ্টা এবং অধ্যাবসায় একজনকে পৌছে দিতে পারে সাফল্যের স্বর্নশিখরে। এক্ষেত্রে ধৈর্য্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া চাই। মহামনীষিদের মূল মন্ত্রই ছিল চেষ্টা এবং অধ্যাবসায়। যথেষ্ট মেধা এবং দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও গৌরবময় ক্যারিয়ার গঠনের নিশ্চয়তা নেই। সেক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থা মেনে নিয়ে আরও চেষ্টা সাধনা করাটাই অধিকতর যৌক্তিক। জীবনের যে কোন পর্যায়ে হতাশ হওয়ার কোন সুযোগ নেই, চাই সেটা ছাত্রজীবনই হোক কিংবা পেশাগত জীবন।

৮. রেফারেন্স নেটওর্য়াক তৈরি
বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি কাজের সন্ধান ও সূত্র মেলে নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যমে। তাই কেরিয়ার গঠনের পথে একটি প্রয়োজনীয় ধাপ হলো রেফারেন্স নেটওয়ার্ক তৈরি । আপনার জানাশোনা বন্ধুবান্ধব অথবা আত্মীয় বর্গের পেশা এবং কর্মজীবন সম্পর্কে অবহিত থাকুন এবং সৌজন্য বিনিময়ের পাশাপাশি ক্যারিয়ার সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নিন। তাদের রেফারেন্স এ ভিন্ন কর্ম সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হোন। এমনকি সাহায্য নিতে পারেন সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মের ।

৯. টেকনোলজিক্যাল জ্ঞান


বর্তমান আধুনিক যুগে নিজের বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত হওয়া ছাড়াও টেকনোলজি সংক্রান্ত জ্ঞান থাকা আবশ্যক হয়ে উঠেছে। যেমন ধরুন এম এস ওয়ার্ড, এম এস এক্সেল, ফটোশপ, ইলাস্ট্রেশন ইত্যাদি বিষয়ে পারদর্শী হওয়া বর্তমান যুগে কেরিয়ার গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ মাইল স্টোনের মতন। অনলাইন ফর্ম ফিলাপ, অনলাইন ট্রানজেকশন, জব অ্যাপ্লিকেশন, ইমেইল এবং বিভিন্ন ডকুমেন্টেশনের জন্য কম্পিউটারের ইন্টারনেট এবং ইনফরমেশন টেকনোলজি বিষয়ে বেসিক জ্ঞান না থাকলেই নয়।

১০. অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো


অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে কাজে লাগাতে হবে সুন্দর ভবিষ্যত গড়ার উদ্দেশ্যে। প্রথম কাজ হল অতীতের কর্মকান্ডের পুর্নাঙ্গ বিশ্লেষন করে ভুল ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করা। অতঃপর ধাপে ধাপে সেগুলো সংশোধনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এবং সবশেষে ভবিষ্যতে যেন একই ধরনের ভুল ত্রুটির উদ্রেক না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে পথ চলা। এক্ষেত্রে ব্যক্তি এবং পেশাগত জীবনে সফল ব্যক্তিবর্গের জীবনচরিত হতে পারে অনুকরনীয় আদর্শ।
সফল ব্যক্তি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবন যাপন করে। যে ব্যক্তি, গোষ্ঠি কিংবা জাতি অতীত আকড়ে বাচতে চেয়েছে, তারা ব্যর্থতার তলানীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তবুও অতীত ভুলে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। বরং সাফল্য ভরা অতীত থেকে অনুপ্রেরনা এবং ব্যর্থতায় ভরা অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়াটাই হতে পারে ভবিষ্যত সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।


১১. আত্ম নিয়ন্ত্রণ এবং আত্ম বিশ্বাস

অনেক সময় অনেকেই হয়তো আপনাকে এবং আপনার কঠোর পরিশ্রমকে প্রেরণা দেওয়ার বদলে সমালোচনা করবে। তাতে দমে না গিয়ে নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখুন এবং নিঃশব্দে পরিশ্রম করে যান এই আত্মবিশ্বাস একদিন আপনাকে পৌঁছে দেবে সফল ক্যারিয়ারের দ্বারপ্রান্তে। অনেক সময় আমরা অতিরিক্ত আনন্দ বা দুঃখে আবেগপ্রবণ হওয়ার কারণে লক্ষ্য থেকে সরে যাই। কিন্তু সফল কেরিয়ার গড়তে গেলে খেয়াল রাখতে হবে কোন বিশেষ অনুভূতি বা উচ্ছ্বাস যেন আমাদের সফলতার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

১২. ইতিবাচক মনোভাব এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা

কিছু কিছু সময় হয়তো যথেষ্ট মেধা এবং দক্ষতা থাকার সত্বেও যোগ্য সম্মান এবং সফলতা আপনার কাছে আসবে না। কিন্তু কখনোই নিজের মনের নেতিবাচক চিন্তাভাবনার স্থান দেবেন না। হতাশা ও অবসাদ থেকে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। নিজেকে কখনোই এতখানি অন্ধকারে ঠেলে দেবেন না। একইভাবে অবহেলা করবেন না আপনার স্বাস্থ্য কে। হতাশ না হয়ে বরং আরো একবার চেষ্টা করুন। অনেক ক্ষেত্রেই নেতিবাচক চিন্তা ভাবনা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে মানুষের মানসিক এমনকি শারীরিক আচরণে পরিবর্তন আসে। কারণ শারীরিক অসুস্থতা অনেক সময় ব্যর্থতার কারণ হতে পারে। প্রতিদিনের রুটিনের মধ্যে নিয়মিত শরীরের যত্ন নিন।

১৩ . পরামর্শদাতা খুঁজুন


চমৎকার নেতৃত্বের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন পেশাদার হতে পারে আপনার মেন্টর। এমন একজন পরামর্শদাতাকে নির্বাচন করা প্রয়োজন, যিনি লক্ষ্যগুলো সম্পাদন করার জন্য প্রয়োজনীয় অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারেন।যখন পথ দেখানোর জন্য একজন গাইড থাকবে, তখন স্ব-উন্নতির জন্য প্রচেষ্টা করা আরও ফলপ্রসূ হবে। পেশাদার অনুপ্রেরণা বা বিশেষজ্ঞের সহায়তা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম। একজন পরামর্শদাতা সবচেয়ে বড় লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে।

সবশেষে মনে রাখবেন সফল ক্যারিয়ারের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা হয় না। তাই নিজের মেধা এবং দক্ষতা অনুযায়ী যে কাজেই আপনি আপনার সন্তুষ্টি খুঁজে পাবেন, সেটাই আপনার জন্য সফলতম ক্যারিয়ার অপশন। তাই নিজেকে সঠিক ভাবে জানুন , আগে নিজেকে পর্যালোচনা করুন, এবং নিজেকে ভালবাসুন, নিজের স্বপ্নগুলোকে খুঁজে নিতে শিখুন।


Post a Comment

Previous Post Next Post