বিদ্যা মানুষের
মূল্যবান সম্পদ, সে
বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু চরিত্র তদপেক্ষাও অধিকতর মূল্যবান। অতএব কেবল
বিদ্বান বলিয়াই কোনো লোক সমাদর লাভের যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে না।
চরিত্রহীন ব্যক্তি যদি নানা বিদ্যায় আপনার জ্ঞানভাণ্ডার পূর্ণ করিয়াও থাকে,
তথাপি তাহার সঙ্গ পরিত্যাগ করা শ্রেয়। প্রবাদ আছে যে,
কোনো কোনো বিষধর সর্পের মন্তকে মণি থাকে। মণি মূল্যবান
পদার্থ বটে। কিন্তু তাই বলিয়া যেমন মণি লাভের নিমিত্ত বিষধর সর্পের সাহচর্য করা
বুদ্ধিমানের কার্য নহে, সেইরূপ বিদ্যা আদরণীয় বিষয় হইলেও বিদ্যালাভের নিমিত্ত বিধান দুর্জনের নিকট
গমন বিধেয় নহে।
সারাংশ: বিদ্যা মূল্যবান বটে, তবে চরিত্রের মূল্য আরো বেশি। যার চরিত্র ভালো নয়, তার জ্ঞান দিয়ে কোনো ভালো ফল আশা করা যায় না। সাপের মাথায় মণি থাকলেও তা ভয়ংকর; চরিত্রহীন বিদ্বান হলেও তার সঙ্গ পরিত্যাগ করা উচিত ।
মাতৃস্নেহের তুলনা নাই;
কিন্তু অতি স্নেহ অনেক সময়ে অমঙ্গল আনয়ন করে। যে স্নেহের
উত্তাপে সন্তানের পরিপুষ্টি, তাহারই আধিক্যে সে অসহায় হইয়া পড়ে। মাতৃস্নেহের মমতার
প্রাবল্যে মানুষ আপনাকে হারাইয়া আসল শক্তির মর্যাদা বুঝিতে পারে না। নিয়ত
মাতৃস্নেহের অন্তরালে অবস্থান করিয়া আত্মশক্তির সন্ধান সে পায় না - দুর্বল,
অসহায় পক্ষিশাবকের মতো চিরদিন স্নেহাতিশয্যে আপনাকে সে
একান্ত নির্ভরশীল মনে করে। ক্রমে জননীর পরম সম্পদ সন্তান অলস,
ভীরু, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হইয়া মনুষ্যত্ব বিকাশের পথ হইতে দূরে
সরিয়া যায়। অন্ধ মাতৃস্নেহ সে কথা বোঝে না - দুর্বলের প্রতি সে স্থিরলক্ষ্য,
অসহায় সন্তানের প্রতি মমতার অন্ত নাই - অলসকে সে প্রাণপাত
করিয়া সেবা করে ভীরুতার দুর্দশার কল্পনা করিয়া বিপদের আক্রমণ - হইতে ভীরুকে
রক্ষা করিতে ব্যস্ত হয়।
সারাংশ: অতিরিক্ত
মাতৃস্নেহ সন্তানের জন্য মঙ্গলজনক নাও হতে পারে। অধিক স্নেহে সন্তানের মধ্যে
স্বনির্ভরতা আসে না; সে অসহায় হয়ে পড়ে। অন্ধ মাতৃস্নেহ দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেয়।
অভাব আছে বলিয়া জগৎ
বৈচিত্র্যময় হইয়াছে। অভাব না থাকিলে জীব-সৃষ্টি বৃথা হইত। অভাব আছে বলিয়া
অভাব-পূরণে এত উদ্যম, এত উদ্যোগ। সংসার অভাবক্ষেত্র বলিয়া কর্মক্ষেত্র। অভাব না থাকিলে সকলেই
স্থাণু-স্থবির হইত, মনুষ্যজীবন বিড়ম্বনাময় হইত। মহাজ্ঞানীগণ অপরের অভাব দূর করিতে সর্বদা
ব্যস্ত। জগতে অভাব আছে বলিয়াই মানুষ সেবা করিবার সুযোগ পাইয়াছে। সেবা মানবজীবনের
পরম ধর্ম। সুতরাং অভাব হইতেই সেবাধর্মের সৃষ্টি হইয়াছে। আর এই সেবাধর্মের দ্বারাই
মানুষের মনুষ্যত্বসুলভ গুণ সার্থকতা লাভ করিয়াছে।
সারাংশ: জীবনে
অসম্পূর্ণতা আছে বলেই মানুষ পূর্ণতার খোঁজ করে। অভাব দূর করার জন্যই সে
কর্মপ্রচেষ্টায় রত থাকে। আবার কিছু মানুষ অন্যের অভাব পূরণের মধ্য দিয়ে মহান
হয়ে ওঠে।
সারমর্ম:
শৈশবে সদুপদেশ যাহার
না রোচে,
জীবনে তাহার কভু
মূর্খতা না ঘোচে।
চৈত্র মাসে চাষ দিয়া না বোনে বৈশাখে,
কবে সেই হৈমন্তিক
ধান্য পেয়ে থাকে?
সময় ছাড়িয়া দিয়া
করে পণ্ডশ্রম,
ফল চাহে,
সেও অতি নির্বোধ, অধম।
খেয়া-তরী চ'লে গেলে বসে এসে তীরে,
কিসে পার হবে,
তরী না আসিলে ফিরে?
সারমর্ম: নৈতিকতা
শেখার যথার্থ সময় শিশুকাল। ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করতে না পারলে জীবন ব্যর্থতায়
পর্যবসিত হয়। এমনকি অসময়ে অতিশ্রমেও কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা সম্ভব হয় না।
ধন্য আশা কুহকিনী!
তোমার মায়ায়
অসার সংসারচক্র ঘোরে নিরবধি।
দাঁড়াইত স্থিরভাবে,
চলিত না হায় !
মন্ত্রবলে তুমি চক্র
না ঘুরাতে যদি।
ভবিষ্যৎ-অন্ধ মূঢ় মানব-সকল
ঘুরিতেছে কর্মক্ষেত্রে
বর্তুল আকার;
তৰ ইন্দ্ৰজালে মুগ্ধ;
পেয়ে তব বল
যুঝিছে জীবন-যুদ্ধ
হায়! অনিবার।
নাচায় পুতুল যথা দক্ষ
বাজিকরে
নাচাও তেমনি তুমি
অর্বাচীন নরে ।
সারমর্ম: আশা
জীবন-সংসারের অদৃশ্য চালিকাশক্তি। আশা না থাকলে মানবজীবন ছবির ও জড়তায় পর্যবসিত
হতো। আশা আছে বলেই এর মন্ত্র মায়ায় মানুষ সামনে এগিয়ে চলে,
সমৃদ্ধির লক্ষ্যে জীবন-যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
দৈন্য যদি আসে,
আসুক, লজ্জা কিবা তাহে?
মাথা উঁচু রাখিস।
সুখের সাথী মুখের পানে
যদি নাহি চাহে,
ধৈর্য ধরে থাকিস।
রুদ্ররূপে তীব্র দুঃখ
যদি আসে নেমে,
বুক ফুলিয়ে দাঁড়াস,
আকাশ যদি বজ্র নিয়ে
মাথায় পড়ে ভেঙে,
ঊর্ধ্বে দু'হাত বাড়াস।
সারমর্ম: বিপদ ও দুঃখে
কাতর হলে চলবে না। ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জীবনের কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়।
সংগ্রাম ছাড়া জীবনে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়।
