বিদ্রোহী' কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর(১,২)/bidrohi CQ ( 1,2)

 



বিদ্রোহী' কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর

সৃজনশীল প্রশ্ন ১

১. যে ব্যক্তির হৃদয় অভাবী, অসহায়, নিঃস্ব, এতিম ও দুর্বলকে দেখে আপ্লুত হয় না, কষ্টে চিত্ত ব্যথিত হয় না; তার মনে প্রেম নেই, মায়া নেই, কোনো মমতা নেই। যার মনে মানবপ্রেম নেই, মসজিদ কিংবা মন্দিরে গিয়ে যতই ফ্রন্দনরত অবস্থায় থাকুক; সৃষ্টিকর্তার প্রেম সে পাবে না, পেতে পারে না, সৃষ্টিকর্তা সবার প্রতিই করুণা করেন কিন্তু প্রেম সবার ললাটে জোটে না।

ক. কবি নিজেকে কার মরম বেদনা বলেছেন?

খ. 'আমি চেঙ্গিস' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?

গ. উদ্দীপকে 'বিদ্রোহী' কবিতার কোন দিকটি ফুটে উঠেছে? ব্যাখ্যা করো।

ঘ. উদ্দীপকে প্রতিফলিত চেতনা 'বিদ্রোহী' কবিতার ক্ষেত্রে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে? বিশ্লেষণ করো।

  ১.নং প্রশ্নের উত্তর

ক. কবি নিজেকে অবমানিতের মরম বেদনা বলেছেন।

খ. কবি নিজের মাঝে বিধ্বংসী যোদ্ধা চেঙ্গিস খানকে কল্পনা করে নিজের বিদ্রোহ ও সংগ্রামকে নতুন মাত্রা দিতে প্রয়াসী হয়েছেন। 'বিদ্রোহী' কবিতায় কবি নানা বিধ্বংসী চরিত্রকে অবলম্বন করে তাঁর দ্রোহের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। এক্ষেত্রে কখনো পুরাণ আবার কখনো ঐতিহাসিক

চেঙ্গিস খানরূপে কল্পনা করেছেন। চেঙ্গিস খান অত্যন্ত নৃশংস ছিলেন। আলোচ্য কবিতায় কবি নিজেকে চেঙ্গিস খান রূপে কল্পনা করে মূলত অপশক্তিকে ধ্বংসের বার্তা দিতে চেয়েছেন।

গ. উদ্দীপকে 'বিদ্রোহী' কবিতায় প্রকাশিত দ্রোহের অন্তরালে কবির মানবপ্রেমের দিকটি প্রকাশিত হয়েছে।

'বিদ্রোহী' কবিতায় কবির বিদ্রোহী সত্তার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। তিনি বিদ্রোহ করেছেন শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়-অত্যাচার ও সামাজিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে। এর মূলে রয়েছে নিপীড়িত মানুষের প্রতি কবির অকৃত্রিম ভালোবাসা। বস্তুত, একটি সুখী ও শান্তিপূর্ণ সময় বিনির্মাণের লক্ষ্যেই কবির এই দ্রোহ।

উদ্দীপকে মানবপ্রেমকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বক্তা মনে

করেন, যে ব্যক্তির মনে মানুষের প্রতি ভালোবাসা নেই, মানুষের দুঃখ- কষ্ট দেখে যার হৃদয় বিগলিত হয় না, পরম স্রষ্টার আশীর্বাদ থেকে সে বঞ্চিত থেকে যায়। অর্থাৎ, মানুষকে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহের পথ প্রশস্ত হয়। অন্যদিকে, 'বিদ্রোহী' কবিতায় কবি অন্যায়- অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করেছেন। নিপীড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার লক্ষ্যেই কবির এই বিদ্রোহ। এর মূলে রয়েছে তাদের প্রতি কবির অকৃত্তি ভালোবাসা। আলোচ্য উদ্দীপকেও মানুষকে ভালোবাসার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সে বিবেচনায়

উদ্দীপকটিতে আলোচ্য করিতর কবির মানবপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। উদ্দীপকটিতে উঠে আসা মানবপ্রেমের চেতনা 'বিদ্রোহী' কবিতায় নিপীড়িত মানুষের প্রতি কবির ভালোবাসার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। ঘ.

'বিদ্রোহী' কবিতার মূলসুর বিদ্রোহী চেতনা হলেও সেই বিদ্রোহের বীজ লুক্কায়িত আছে প্রেমে। কেননা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ন থাকলে কেউ অন্যের দুঃখ-বেদনা নিজের মাঝে অনুভব করতে পারে না। কবিও তার ব্যতিক্রম নন। তিনি সর্বগ্রাসী বিদ্রোহী রূপ ধারণ করেছেন মূলত প্রেমের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে। মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসাই তাঁকে দ্রোহের পথে চালিত করেছে।

উদ্দীপকে মানুষকে ভালোবাসতে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। উদ্দীপকটির বক্তা মনে করেন, স্রষ্টার অনুগ্রহ লাভের জন্য সর্বাগ্রে মানুষকে ভালোবাসতে হবে। অন্যথা সেই ব্যক্তি মসজিদ-মন্দিরে গিয়ে যতই কান্নাকাটি করুক তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তাছাড়া যে ব্যক্তির মনে আর্ত- পীড়িত মানুষের প্রতি করুণা তৈরি হয় না, মানুষের অসহায়ত্ব দেখে যার মন কাঁদে না মানবিকতাবিবর্জিত সেই ব্যক্তি মানুষের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবে। এভাবে আলোচ্য উদ্দীপকটিতে মূলত মানবপ্রেমের চেতনাই ফুটে উঠেছে।

'বিদ্রোহী' কবিতায় দ্রোহের অন্তরালে নিপীড়িত মানুষের প্রতি কবির গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বস্তুত, সামাজিক অচলায়তন ও ভেদ-বৈষম্য দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই পরাধীনতার শৃঙ্খলকে ভাঙতে চেয়েছেন তিনি। নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তাঁর এই নিরন্তর সংগ্রাম। কবিহৃদয়ের প্রগাঢ় মানবিকবোধই এর কারণ। একইভাবে, আলোচ্য উদ্দীপকটিতেও মানুষকে ভালোবাসার মাধ্যমে পরম স্রষ্টার অনুগ্রহ লাভের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সেখানে মানবপ্রেমের জয়গানই ধ্বনিত হয়েছে, যা আলোচ্য কবিতারও অন্যতম বিষয়। সে বিবেচনায় উদ্দীপকের প্রতিফলিত মানবপ্রেমের চেতনা

২. কারবালা ময়দানে ইমাম হোসেন তাঁর বাহাত্তরজন সঙ্গীসহ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। শত অনুরোধ ও ভয-ভীতি উপেক্ষা করে তিনি সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করেছেন। মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছেন, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। সকলেই যখন অর্থলোভে, রাজ্যলোভে বা মৃত্যুভয়ে ইয়াজিদের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে, তখন তিনি একাই ইয়াজিদি শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।

ক. কাজী নজরুল ইসলাম কোথা থেকে নিম্ন প্রাইমারি পাস করেন?

খ. কবি নিজেকে 'মহা-প্রলয়ের নটরাজ' বলেছেন কেন?

গ. উদ্দীপকের সাথে 'বিদ্রোহী' কবিতার সাদৃশ্য কোন দিক থেকে? ব্যাখ্যা করো।

ঘ. "চির-উন্নত মম শির' উদ্ভিটিতে প্রকাশিত আদর্শবোধই উদ্দীপকের ইমাম হোসেনের মাঝে প্রতিফলিত হয়েছে- মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

২. নং প্রশ্নের উত্তর

ক. কাজী নজরুল ইসলাম গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন প্রাইমারি পাশ করেন। 

খ. নটরাজ শিবের মতো ধ্বংসলীলা চালিয়ে অপশক্তি নাশ করে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই করি নিজেকে মহা-প্রলয়ের নটরাজ বলেছেন। ভারতীয় পুরাণ মতে, নৃত্যকলার উদ্ভাবক হিসেবে মহাদেব শিবের আর এক নাম নটরাজ। তাঁর ধ্বংসের সময়কার নৃত্যকে তাণ্ডব নৃত্য বলা হয়। গজাসুর ও কালাসুরকে নিধন করে তিনি তাণ্ডব নৃত্য করেছিলেন। কবিও পুরাণের সে ঐতিহ্য স্মরণ করে সমকালীন প্রেক্ষাপটে অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীসহ সকল প্রকার অপশক্তিকে ধ্বংস করতে চেয়েছেন। তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নিজেকে তিনি মহা-প্রলয়ের নটরাজ বলে অভিহিত করেছেন।

গ. অপশক্তির বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাবের দিক থেকে উদ্দীপকের সাথে 'বিদ্রোহী' কবিতাটি সাদৃশ্যপূর্ণ।

'বিদ্রোহী' কবিতায় কবি অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। সেসময় পরাধীন ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত হচ্ছিল মানুষ। নিপীডড়িত মানুষের সেই আর্তনাদ ব্যথিত করে কবিচিত্র্যকে। সংগত কারণেই সমাজসচেতন কবি তাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সগর্বে উচ্চারণ করেন দ্রোহের পঙক্তিমালা। 'বিদ্রোহী' কবিতাটি তারই ফল। উদ্দীপকে সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় ইমাম হোসেনের সংগ্রামের কথা

বলা হয়েছে। সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে কারবালা ময়দানে এক অন্যায় যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেছেন তিনি। তবুও রাজশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ইয়াজিদ বাহিনীর অন্যায়কে কখনো মেনে নেননি, বশ্যতা স্বীকার করেননি তার কাছে। আলোচ্য 'বিদ্রোহী' কবিতায়ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রায় একইরূপ দৃঢ়তা লক্ষ করা যায়। সেখানে অপশক্তির বিনাশ কামনায় কবি বিধ্বংসী নানা পৌরাণিক চরিত্রকে অবলম্বন করেছেন। কবিতাটিতে তিনি অন্যায়ের অবসান না হওয়া পর্যন্ত তাঁর এই সংগ্রাম অব্যাহত রাখার ঘোষণা শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মানবমুক্তির এই সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন তিনি। অর্থাৎ, আলোচ্য কবিতা এবং উদ্দীপকে বিরুদ্ধ শক্তির কাছে মাথা নত না করার দৃঢ়তা লক্ষ করা যায়। এদিক থেকে উদ্দীপকের সাথে আলোচ্য কবিতাটি সাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. প্রশ্নোত্ত উদ্ভিটিতে ফুটে ওঠা আদর্শবোধ তথা অপশক্তির কাছে মাথা নত না করার দৃঢ়তা উদ্দীপকের ইমাম হোসেনের চরিত্রে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।

'বিদ্রোহী' কবিতায় ফুটে ওঠা দ্রোহ নিছক মানবমনের ক্ষোভ বা দুঃখের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এক আদর্শবোধের নামান্তর। এ কবিতার ছত্রে দর্শবোধই প্রতিফলিত হয়েছে। এখানে কখনো কবি ধ্বংসের প্রতীক, কখনো তিনি প্রেমের প্রতীক, কখনো বা মানবতাবাদের প্রতীক হয়ে অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে দ্রোহ করেছেন তিনি। এক্ষেত্রে কবির আপসহীন মনোভাবের পরিচয় মেলে।  উদ্দীপকের ইমাম হোসেন ইয়াজিদি রাজশক্তির অন্যায়, অবিচার ও অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। যেখানে রাজশক্তির অধীনস্থ রাষ্ট্রীয় বাহিনী ছিল সুবিশাল, সেখানে মাত্র বাহাত্তর জন সঙ্গী নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে তিনি অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। এক্ষেত্রে হার জিত তাঁর কাছে মুখ্য ছিল না; আদর্শ প্রতিষ্ঠাই ছিল মূল লক্ষ্য। একইভাবে, 'বিদ্রোহী' কবিতার কবিও সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। অত্যাচারিত ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন।

'বিদ্রোহী' কবিতায় এবং উদ্দীপকে যুগপৎভাবে অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করার কথা বর্ণিত হয়েছে। মলত একটি আদর্শবোধকে কেন্দ্র করেই চালিত হয়েছে; আর তা হলো- সাম্যচেতনা ও ন্যায়। এ আদর্শকে ধারণ করেই ইমাম হোসেন এবং আলোচ্য কবিতার কবি বিদ্রোহ করেছেন। পরাজয়ের সম্ভাবনা জেনেও মানমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পিছপা হননি। অর্থাৎ, শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তাঁরা ছিলেন আপসহীন। আলোচ্য কবিতার উদ্ভিটিতে এ ভাবাদর্শই প্রতিফলিত হয়েছে। সে বিবেচনায় প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।


Post a Comment

Previous Post Next Post