'এখন যৌবন যার
মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। কবি হেলাল হাফিজ শহিদ আসাদের স্মরণে এ কবিতাটি
লিখেছিলেন। প্রবল ছাত্র আন্দোলনে পুলিশ গুলি করে আসাদকে হত্যা করে। আসাদের মতো আরও
অনেকের আত্মত্যাগের কারণে উক্ত আন্দোলনটি সফল হয়। পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ
নির্বাচনেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে।
ক. ২১
ফেব্রুয়ারি কত সাল থেকে শহিদ দিবস হিসেবে পালন হয়ে আসছে?
খ.'মৌলিক গণতন্ত্র' ধারণটি ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকে যে আন্দোলনের
ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে তার পটভূমি ব্যাখ্যা কর।
ঘ."পাকিস্তানের
প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল উক্ত আন্দোলনের প্রভাব - পর্যালোচনা কর।
২ নম্বর সৃজনশীল
প্রশ্নের উত্তর
খ. ১৯৫৮ সালে
পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান নিজের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী
করার লক্ষ্যে যে পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি চালু করেন, তা-ই মৌলিক গণতন্ত্র নামে পরিচিত। মৌলিক
গণতন্ত্র ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মোট ৮০ হাজার
নির্বাচিত ইউনিয়ন কাউন্সিল সদস্য নিয়ে নির্বাচকমণ্ডলী গঠন করার কথা বলা হয়।
তাদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার
বিধান রাখা হয়। এটি ছিল পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিমূলক ব্যবস্থা।
গ . উদ্দীপকে যে
আন্দোলনকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তা হলো ৬৯-এর গণআন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থান। কারণ ৬৯-এর
গণআন্দোলনেই আসাদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কবি হেলাল হাফিজ তার স্মরণে উদ্দীপকে
উল্লিখিত এ কবিতাটি রচনা করেছিলেন। '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক
ও ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি একটি মাত্র ঘটনা থেকে
সংঘটিত হয়নি। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। মূলত
১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি যখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা মেনে না নিয়ে উল্টো দমনপীড়ন
শুরু করে তখন আন্দোলন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে আগরতলা মামলা দিয়ে
বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে। কারাগারে প্রেরণ করে, বাঙালি তখন আর দমে থাকতে চায়নি। শুধু হয়
সাধারণ জনগণসহ ছাত্র সমাজের ১১ দফা আন্দোলন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনকে
কেন্দ্র করে ১৯৬৮ সালে ছাত্র অসন্তোষ দেখা দেয়। এ অসন্তোষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শহর
ও গ্রামের শ্রমিক কৃষক ও নিম্ন আয়ের পেশাজীবীসহ বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের নিকট
আইয়ুব খানের পদত্যাগের দাবি তুলে সাধারণ মানুষ একযোগে পথে নামেন। ছাত্রসমাজসহ
জনগণের এই ক্রোধ থামাতে আইয়ুব সরকার হত্যার পথ বেছে নেয়। একে একে হত্যা করা হয়
আসাদসহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে । পাশাপাশি আরও অনেককেই
হত্যা করা হয়। অর্থাৎ পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর নিপীড়ন ও বঞ্ছনা এবং তার বিপরীতে
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামসহ পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে
গড়ে ওঠা আন্দোলন ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব রেখেছিল । এ
আন্দোলনের মাধ্যমে আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে। অতএব নিশ্চিতভাবেই বলা যায়,
উপরিউক্ত ঘটনাপ্রবাহের
আলোকেই ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল।
ঘ. পাকিস্তানের
প্রথম সাধারণ নির্বাচন বলতে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনকেই বোঝায়। আর এ
নির্বাচনের ফলাফলে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব পরে। কথাটি যৌক্তিক
১৯৬৯ সালের
গণঅভ্যুত্থানের ফলে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং এর
পূর্বেই তিনি 'ঐতিহাসিক আগরতলা
মামলা, তুলে নেন। আর
জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার বাধ্য হয় ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের সাধারণ
নির্বাচন দিতে। গণঅভ্যুত্থানের ফলে পূর্ব বাংলার জনগণের মাঝে জাতীয়তাবাদী
চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রয়োজনীয়তা তাদের কাছে স্পষ্ট
হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে
সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে ছয় দফার পক্ষে গণভোট
হিসেবে অভিহিত করে। নির্বাচনে ৫ কোটি ৬৪ লাখ ভোটারের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ৩
কোটি ২২ লাখ। আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন
লাভ করে। সংরক্ষিত মহিলা আসন ৭টিসহ ১৬৭টি আসন লাভ করে জাতীয় পরিষদে একক
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আবার পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক পরিষদের সংরক্ষিত ১০টি
মহিলা আসনসহ ৩১০টি আসনের আওয়ামী লীগ ২৯৮টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
অর্জন করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ বিজয় ছিল নজিরবিহীন।
পরিশেষে বলা যায়
যে, ১৯৭০-এর নির্বাচনে ৬৯-এর
গণঅভ্যুত্থানের সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছিল। তাই প্রশ্নোক্ত কথাটির সাথে আমি সম্পূর্ণ
একমত পোষণ করি।
